যশোর ও খুলনা অঞ্চলের ভবদহ এলাকায় বৃষ্টি নামলেই এখনও নতুন করে দুর্ভোগ শুরু হয় লাখো মানুষের। বাড়ির আঙিনা, শোবার ঘর, রান্নাঘর, এমনকি গোয়ালঘর পর্যন্ত তলিয়ে যায় পানিতে। কোথাও হাঁটুপানি, কোথাও আবার কোমরসমান। বাধ্য হয়ে অনেকেই গবাদিপশু নিয়ে আশ্রয় নেন উঁচু সড়কে। বছরের পর বছর ধরে চলে আসা এই সংকট নিরসনে গত চার দশকে ২১টির বেশি প্রকল্পে হাজার কোটি টাকার বেশি খরচ হলেও স্থায়ী কোনো সমাধান মেলেনি এখনো।
চলতি বছরের আগস্টের শুরুতে টানা ভারী বৃষ্টিতে ভবদহের নিচু এলাকার প্রায় পঞ্চাশটি গ্রাম নতুন করে প্লাবিত হয়। বাড়িঘরের পাশাপাশি স্কুল-কলেজ, রাস্তাঘাট, উপাসনালয় ও মাছের ঘেরও ডুবে যায় পানিতে। যশোর সদর উপজেলার একাংশ, অভয়নগর, মনিরামপুর ও কেশবপুর এবং খুলনার ডুমুরিয়া ও ফুলতলা—এই ছয় উপজেলা মিলিয়েই পরিচিত ভবদহ অঞ্চল নামে। এই অঞ্চলের চুয়ান্নটি বিলের পানি সাধারণত নিষ্কাশিত হয় শ্রী নদীর ওপর নির্মিত ভবদহ স্লুইসগেট দিয়ে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ২০১৩ সালের পর থেকে এলাকার কোনো বিলেই জোয়ারাধার পদ্ধতি বা টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট চালু নেই। এর ফলে বছরের পর বছর ধরে পলি জমে মুক্তেশ্বরী, টেকা, শ্রী ও হরি নদীর তলদেশ উঁচু হয়ে গেছে, যার কারণে বিলের পানি স্বাভাবিকভাবে নদীতে গিয়ে পড়তে পারছে না। অভয়নগর উপজেলার পায়রা, কোটা, দিঘলিয়া, দামোখালি, সুন্দলী, রাজাপুরসহ পঞ্চাশের কাছাকাছি গ্রাম এবং নওয়াপাড়া পৌরসভার একাধিক এলাকায় সাম্প্রতিক সময়েও বাড়িঘরের আঙিনায় পানি উঠতে দেখা গেছে।
সংকট মোকাবিলায় ২০২৫ সালের অক্টোবরে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে প্রায় ১৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে হরিহর, হরি-তেলিগাতি, আপার ভদ্রা, টেকা ও শ্রী নদীর সাড়ে একাশি কিলোমিটার অংশ পুনঃখননের কাজ শুরু হয়। লক্ষ্য ছিল ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে কাজ শেষ করা। কাজ প্রায় শেষের দিকে থাকলেও বাস্তবে তার সুফল খুব একটা পাননি স্থানীয়রা। বর্তমানে স্লুইসগেটে চারটি পাম্প চালু থাকলেও জলকপাটগুলো ঠিকমতো ওঠানামা করছে না বলে অভিযোগ রয়েছে; আরও পাঁচটি পাওয়ার পাম্প বসানোর কাজ চলমান।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, নদী খননের সময় খর্ণিয়া সেতুর কাছে ভদ্রা নদীতে দেওয়া অস্থায়ী আড়বাঁধের কারণে নিচের দিকে প্রায় ছয় কিলোমিটার নদী ভরাট হয়ে গেছে, যা পানি নিষ্কাশনে বড় বাধা তৈরি করছে। এ ছাড়া পানি নামার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পথ আমডাঙ্গা খাল দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় সেই পথেও পানি ঠিকমতো বের হতে পারছে না। ফলে বৃষ্টির পানি বিল ছাপিয়ে সরাসরি ঢুকে পড়ছে আশপাশের বসতিতে।
অভয়নগরের ডুমুরতলা গ্রামের এক কলেজশিক্ষক জানান, তাঁর গ্রামের দেড় শতাধিক বাড়ির প্রায় সবগুলোর উঠানে হাঁটুসমান পানি জমেছিল সম্প্রতি, নতুন বৃষ্টি হলে আবার রাস্তায় আশ্রয় নিতে হবে বলে আশঙ্কা তাঁর। মনিরামপুরের সুজাতপুর গ্রামের এক গৃহবধূ বলেন, আগস্টের শুরুর বৃষ্টিতে তাঁর তিনটি ঘরের দুটিই পানির নিচে চলে গিয়েছিল, ঘরের জিনিসপত্র সরিয়ে গবাদিপশু নিয়ে উঁচু সড়কে গিয়ে অস্থায়ী চালা তুলে রাত কাটাতে হয়েছে সাপ-পোকামাকড়ের ভয় নিয়ে। তাঁর প্রশ্ন, বছরের পর বছর এই কষ্ট নিয়ে আর কত দিন কাটাতে হবে।
গত জুলাই মাসে দুই দফা ভারী বর্ষণে ভবদহের সাতাশটি বিল প্লাবিত হয়ে মণিরামপুর, কেশবপুর ও অভয়নগরের শতাধিক গ্রাম আবারও জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে। স্থানীয়দের হিসাবে, তিন উপজেলার বারোটি ইউনিয়নের প্রায় আশি হাজার মানুষ পাঁচ থেকে ছয় দিন পানিবন্দি অবস্থায় ছিলেন। মণিরামপুরের ডহর মশিয়াহাটী গ্রামের এক বাসিন্দা জানান, বৃষ্টি হলেই উঠানে পানি জমে যাওয়ায় যাতায়াতের জন্য বাঁশের সাঁকো বানাতে হয়, এমনকি মাছ ধরার ফাঁদও পাততে হয় ঘরের সামনে।
স্থানীয় একটি পানি নিষ্কাশন আন্দোলন কমিটির নেতৃত্ব জানিয়েছেন, চলতি মাসের শুরুতেও যশোর, খুলনা ও সাতক্ষীরার দুই শতাধিক গ্রাম নতুন করে পানিতে তলিয়ে গিয়েছিল। তাঁদের দাবি, দ্রুত আমডাঙ্গা খালের সংস্কার শেষ করা, কাজে দেরির জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, খর্ণিয়া এলাকার সব অস্থায়ী বাঁধ সরিয়ে ফেলা এবং নদীর জমে থাকা পলি অপসারণ জরুরি ভিত্তিতে করতে হবে। তাঁদের ভাষ্য, হাজার কোটি টাকা খরচ হলেও বাস্তবে কার্যকর কাজ হচ্ছে না।
স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ডের একজন প্রকৌশলী জানিয়েছেন, খর্ণিয়া সেতু এলাকার প্রতিবন্ধকতা ইতিমধ্যে সরিয়ে ফেলা হয়েছে এবং ভবদহের তিনটি স্লুইসগেট খুলে দেওয়া হয়েছে; পাশাপাশি উন্নয়নকাজও চলমান রয়েছে।
সংকট নিয়ে গবেষকদের বিশ্লেষণ বলছে, শুধু নদী খনন করে ভবদহের সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। দীর্ঘদিনের পলি জমে নদীগুলোর প্রশস্ততা বহুলাংশে কমে গেছে—একসময় দুই থেকে তিনশ ফুট চওড়া নদী এখন সংকুচিত হয়ে মাত্র পনেরো থেকে পঁচিশ ফুটে দাঁড়িয়েছে, যা স্বাভাবিক পানি ধারণ ও নিষ্কাশনের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। এ ছাড়া স্লুইসগেটগুলো মূল খালের তুলনায় ছোট বা অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত হওয়ায় এবং জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক প্রবাহ বাঁধ দিয়ে আটকে খননকাজ চালানোয় পানি সহজে বের হতে পারছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য কেবল নদী খনন নয়, বরং জোয়ার-ভাটার প্রাকৃতিক প্রবাহ ব্যবহার করে বিলে পরিকল্পিতভাবে পলি ফেলার ব্যবস্থা, স্থানীয় জনগণের মতামতের ভিত্তিতে সমন্বিত পরিকল্পনা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অন্যথায় চার দশকের অভিজ্ঞতা যা বলছে, তাতে আগামী বর্ষায়ও একই চিত্রের পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও বিশ্লেষকেরা।

