অন্যায়-শোষণের বিরুদ্ধে দ্রোহের প্রতীক আর প্রেম-সাম্যের কবি হিসেবে বাঙালির হৃদয়ে চিরস্থায়ী আসন গড়ে নেওয়া জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের পঞ্চাশতম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট, বাংলা সনের হিসেবে ১২ ভাদ্র ১৩৮৩, ঢাকার তৎকালীন পিজি হাসপাতালে (বর্তমানে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়) শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন বাংলা সাহিত্যের এই দীপ্তিমান কবি। আজকের দিনে তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছে গোটা জাতি।
১৮৯৯ সালের ২৪ মে, বাংলা সনের ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৩০৬, পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্ম নেন কাজী নজরুল ইসলাম। পারিবারিক দারিদ্র্যের কারণে ছোটবেলায় তাঁকে ডাকা হতো ‘দুখু মিয়া’ নামে। মাত্র নয় বছর বয়সে বাবাকে হারিয়ে সংসারের হাল ধরতে তাঁকে মসজিদে মুয়াজ্জিনের কাজ এবং মক্তবে শিক্ষকতা করতে হয়। এরপর তিনি যোগ দেন লেটো গানের দলে, সেখান থেকেই গান আর নাটকের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা শুরু, যা পরবর্তী জীবনে তাঁর সাহিত্য ও সংগীতসাধনার ভিত্তি তৈরি করে দেয়।
সৃজনশীল লেখক হিসেবে নজরুলের কর্মজীবন স্থায়ী হয়েছিল মাত্র তেইশ বছর, অথচ এই স্বল্প সময়েই তিনি বাংলা সাহিত্যকে দিয়েছেন অজস্র অমূল্য সৃষ্টি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সেনাবাহিনীতে কাজ করার অভিজ্ঞতা নিয়ে ফেরার পর ১৯২২ সালে লেখেন তাঁর সবচেয়ে আলোচিত কবিতা ‘বিদ্রোহী’, যা প্রকাশের পরপরই তাঁকে খ্যাতির চূড়ায় পৌঁছে দেয় এবং যেখানে তিনি নিজেকে ঘোষণা করেন চিরবিদ্রোহী হিসেবে। একই বছর তিনি সম্পাদনা করেন ‘ধূমকেতু’ পত্রিকা, যেখানে ব্রিটিশবিরোধী লেখার কারণে তাঁকে কারাদণ্ড ভোগ করতে হয়। জেলে বসেই লেখেন তাঁর বিখ্যাত ‘রাজবন্দীর জবানবন্দি’।
নজরুলের কবিতা ও গান বাংলা সাহিত্যে এনেছিল এক নতুন জাগরণ। তাঁর রচনা যুগে যুগে মানুষকে শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রেরণা জুগিয়েছে। একই সঙ্গে তিনি ছিলেন প্রেমেরও কবি—নিজের ভাষাতেই তিনি বলেছিলেন যে এক হাতে তাঁর বাঁশি, আরেক হাতে যুদ্ধের তূর্য, যা তাঁর সাহিত্যসত্তার দুই দিক—প্রেম আর বিদ্রোহ—একসঙ্গে ফুটিয়ে তোলে। প্রায় সাড়ে তিন হাজার গান রচনা করেছেন তিনি, যা আজ ‘নজরুলগীতি’ নামে বাংলা সংগীতের একটি আলাদা ধারা হিসেবে স্বীকৃত। কবিতা, ছোটগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ ও নাটক মিলিয়ে তাঁর রচনার পরিধি বিশাল—তাঁর একাধিক কাব্যগ্রন্থ তাঁর সাম্যবাদী ও মানবতাবাদী চিন্তাধারার সাক্ষ্য বহন করে।
১৯৪২ সালের দিকে এক দুরারোগ্য স্নায়বিক রোগে আক্রান্ত হয়ে কবি হারিয়ে ফেলেন কথা বলার ও স্মৃতিশক্তি—পরে চিহ্নিত হয় এই রোগ পিক্স ডিজিজ নামে। প্রায় তিন দশক ধরে এই অবস্থায় নির্বাক জীবন কাটাতে হয় তাঁকে, যা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক গভীর বেদনার অধ্যায়।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ২৪ মে তৎকালীন সরকারপ্রধানের উদ্যোগে ভারত সরকারের সম্মতিতে কবিকে পরিবারসহ বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়। তাঁকে দেওয়া হয় জাতীয় কবির মর্যাদা এবং রাজধানীর ধানমন্ডিতে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় থাকার জন্য একটি বাড়ি বরাদ্দ করা হয়।
১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডি-লিট উপাধি প্রদান করে। ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে দেশের নাগরিকত্ব দেয় এবং একই বছরের একুশে ফেব্রুয়ারি তাঁকে ভূষিত করা হয় একুশে পদকে। মৃত্যুর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে সমাহিত করা হয়, যেখানে আজও প্রতিবছর দেশ-বিদেশ থেকে মানুষ ছুটে আসেন শ্রদ্ধা জানাতে।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম কেবল একজন কবি নন—তিনি বাঙালির চেতনায় চিরজাগরূক এক নাম, যাঁর সৃষ্টি আজও অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে এবং মানবতার পক্ষে কথা বলতে মানুষকে সাহস জোগায়।
কবির প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে আজ দেশজুড়ে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। একটি সাহিত্য প্রতিষ্ঠান আয়োজন করেছে আলোচনা সভা, দোয়া মাহফিল ও হামদ-নাতের অনুষ্ঠান। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হচ্ছে আলোচনা সভা, কবিতা আবৃত্তি ও নজরুলসংগীত পরিবেশনা। সকাল থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে কবির সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ।

