নেপাল থেকে চীন, ভারত-পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ একই সময়ে ভয়াবহ বন্যার এই বিস্তার কি কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নাকি মানুষের দীর্ঘদিনের পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রকৃতির ভয়ংকর পাল্টা প্রতিক্রিয়া?
প্রকৃতি কি সত্যিই প্রতিশোধ নেয়?
বৈজ্ঞানিক ভাষায় হয়তো উত্তরটি হবে-না। প্রকৃতির কোনো রাগ, প্রতিহিংসা বা অভিশাপ নেই। কিন্তু মানুষের কর্মকাণ্ড যখন নদীর গতিপথ বদলে দেয়, পাহাড় কেটে ফেলে, বন উজাড় করে, জলাভূমি ভরাট করে, অপরিকল্পিত নগরায়ন চালায় এবং বায়ুমণ্ডলে বিপুল পরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস ছড়িয়ে দেয় তখন প্রকৃতির ভারসাম্য ভেঙে পড়ে। আর সেই ভাঙনের মূল্যই মানুষকে দিতে হয় বন্যা, ভূমিধস, খরা, তাপপ্রবাহ ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো ভয়াবহ দুর্যোগের মাধ্যমে।
আজ এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ঘটে চলা বন্যাগুলো সেই বাস্তবতাকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
হিমালয় থেকে বঙ্গোপসাগর: একই দুর্যোগের ভিন্ন রূপ
নেপাল ও চীনের তিব্বত সীমান্তবর্তী হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞ ঘটিয়েছে। পাহাড়ি জনপদ, সড়ক, সেতু ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে হিমবাহ-সম্পর্কিত বরফ ও শিলাধস, নদীতে অস্থায়ী বাঁধ সৃষ্টি এবং পরে হঠাৎ পানির স্রোত নেমে আসার মতো কারণের কথা উঠে এসেছে।
এটি শুধু একটি স্থানীয় বন্যা নয়। এর পেছনে রয়েছে উষ্ণ হয়ে ওঠা হিমালয়ের গভীর সংকট। হিমবাহ গলছে, নতুন নতুন হিমবাহ-হ্রদ তৈরি হচ্ছে, বরফ ও পাহাড়ের স্থিতিশীলতা কমছে। ফলে পাহাড়ি অঞ্চলে অতিবৃষ্টি, হিমবাহ-হ্রদ বিস্ফোরণ বা বরফধস ঘটলে মুহূর্তের মধ্যে নদী পরিণত হতে পারে মৃত্যুর স্রোতে।
ভারতের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলেও ভয়াবহ বর্ষা ও বন্যা লাখো মানুষের জীবন বিপর্যস্ত করেছে। ব্রহ্মপুত্রসহ বিভিন্ন বৃহৎ নদীর অববাহিকায় অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও নদীর অতিরিক্ত চাপ বিপুল জনপদকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
পাকিস্তানেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মৌসুমি বন্যা ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে। হাজারো মানুষের মৃত্যু, লাখ লাখ মানুষের বাস্তুচ্যুতি এবং কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা দক্ষিণ এশিয়ার জলবায়ু ঝুঁকির বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছে।
চীনেও অতিবৃষ্টি, টাইফুন ও আকস্মিক বন্যার প্রভাবে বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটিও প্রকৃতির এই পরিবর্তিত আচরণের সামনে অসহায় হয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশও এই দুর্যোগচক্রের বাইরে নয়। অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল, নদীর পানি বৃদ্ধি ও ভূমিধসে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রাণহানি, ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত এবং লাখো মানুষের দুর্ভোগের ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল, হাওর এবং নদীবেষ্টিত এলাকাগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
তাহলে কি সবকিছুর জন্য জলবায়ু পরিবর্তন দায়ী?
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিটি বন্যার একমাত্র কারণ নয়, কিন্তু এটি দুর্যোগকে আরও ভয়ংকর করে তুলছে।
উষ্ণ বায়ুমণ্ডল বেশি জলীয়বাষ্প ধরে রাখতে পারে। ফলে যখন বৃষ্টি হয়, তা অনেক সময় অল্প সময়ের মধ্যে অত্যন্ত তীব্রভাবে নেমে আসে। সমুদ্র ও বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বৃদ্ধি মৌসুমি বৃষ্টির স্বাভাবিক ছন্দকে অনিশ্চিত করে তুলছে। কোথাও দীর্ঘ খরা, আবার কোথাও কয়েক ঘণ্টার প্রবল বর্ষণে মাসের সমপরিমাণ বৃষ্টিপাত নেমে আসছে।
অর্থাৎ সমস্যাটি শুধু বেশি বৃষ্টি নয়; সমস্যাটি হলো অস্বাভাবিক সময়ে, অস্বাভাবিক তীব্রতায় এবং অস্বাভাবিক পরিমাণে বৃষ্টি।
মানবসৃষ্ট উষ্ণায়ন এ ধরনের প্রবল বর্ষণ, আকস্মিক বন্যা ও চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে হিমালয় ও দক্ষিণ এশিয়ার মতো অঞ্চল জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোর একটিতে পরিণত হচ্ছে।
কিন্তু শুধু প্রকৃতিকে দোষ দিলে চলবে না
প্রকৃতির দুর্যোগকে মানুষের বিপর্যয়ে পরিণত করার পেছনে মানুষের নিজের হাতও কম দায়ী নয়।
পাহাড় কেটে হোটেল, রিসোর্ট ও সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে। দখল করা হচ্ছে নদী তীর। জলাভূমি ভরাট করে তৈরি হচ্ছে আবাসন প্রকল্প। বন উজাড় করে কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে প্রাকৃতিক পানি ধারণক্ষমতা। শহরের খাল ও ড্রেন বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। নদীতে দেওয়া হচ্ছে অপরিকল্পিত বাঁধ, সেতু ও অবকাঠামোর চাপ।
ফলে যে পানি একসময় বন, জলাভূমি ও নদীর প্রাকৃতিক ব্যবস্থার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ত, এখন সেটি ছুটে আসে জনবসতির দিকে।
একটি পাহাড়ে গাছ কাটার সিদ্ধান্ত হয়তো ছোট মনে হতে পারে। একটি খাল ভরাট করাও হয়তো উন্নয়ন মনে হয়। নদীর তীর দখলও কারও কাছে ব্যবসা। কিন্তু হাজার হাজার এমন সিদ্ধান্ত একত্রিত হয়ে তৈরি করে একটি দুর্যোগের কারখানা।
উন্নয়ন কি তবে শত্রু?
না, উন্নয়ন শত্রু নয়।
তবে মূল সমস্যা হলো প্রকৃতিকে অস্বীকার করে উন্নয়ন।
হিমালয়ের মতো ভঙ্গুর পাহাড়ে অপরিকল্পিত সড়ক, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ও নির্মাণকাজ ঝুঁকি বাড়াতে পারে। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে নিচের জনপদে বিপর্যয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়। শহর যখন নিজের জলাভূমি হারায়, তখন কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিই নগরকে ডুবিয়ে দিতে পারে।
প্রকৃতি উন্নয়নের বিরুদ্ধে নয়। কিন্তু প্রকৃতির নিয়ম ভেঙে করা উন্নয়নের বিরুদ্ধে প্রকৃতির প্রতিক্রিয়া অনিবার্য।
#বন্যা শুধু একটি দেশের সমস্যা নয়
নেপালের পাহাড়ে যে পানি নেমে আসে, তার প্রভাব সীমান্ত মানে না। হিমালয়ের নদীগুলো এক দেশ থেকে অন্য দেশে প্রবাহিত হয়। ভারত, নেপাল, চীন, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের জলবায়ু ও নদীব্যবস্থা কোনো বিচ্ছিন্ন বাস্তবতা নয়।
উজানে বন ধ্বংস হলে ভাটিতে পলি বাড়ে। পাহাড়ে হিমবাহ গললে নিচের নদীর আচরণ বদলে যায়। এক দেশের অপরিকল্পিত অবকাঠামো অন্য দেশের নদী ও জনপদের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই বন্যা মোকাবিলা শুধু জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়; (এটি এখন আঞ্চলিক সহযোগিতা, আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু ন্যায়ের প্রশ্ন।
#প্রকৃতির প্রতিশোধ নয়, মানুষের তৈরি প্রতিক্রিয়া
“প্রকৃতি প্রতিশোধ নিচ্ছে” বাক্যটি আবেগের। কিন্তু এর ভেতরে একটি কঠিন সত্য রয়েছে।
প্রকৃতি প্রতিশোধ নিচ্ছে না। প্রকৃতি তার নিজের নিয়মে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে।
- আমরা বায়ুমণ্ডল উষ্ণ করেছি- বায়ুমণ্ডল বদলেছে।
- আমরা পাহাড় কেটেছি- পাহাড় দুর্বল হয়েছে।
- আমরা বন উজাড় করেছি-মাটি পানি ধরে রাখার ক্ষমতা হারিয়েছে।
- আমরা নদী দখল করেছি-নদী তার জায়গা ফিরে নিতে চেয়েছে।
- আমরা জলাভূমি ভরাট করেছি-পানি মানুষের ঘরে ঢুকেছে।
- এটি কোনো অলৌকিক অভিশাপ নয়। এটি কারণ ও ফলের নির্মম সমীকরণ।
যে সতর্কবার্তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই
নেপাল, চীন, ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বন্যা আমাদের সামনে একটাই বড় প্রশ্ন রেখে যাচ্ছে – আমরা কি এখনও দুর্যোগকে কেবল “প্রাকৃতিক বিষয়” বলে দায় এড়িয়ে যাব?
নাকি স্বীকার করব, জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশবিধ্বংসী উন্নয়নের যুগে প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে জেতা সম্ভব নয়?
শত শত প্রাণহানি আমাদের কেবল শোকের সংবাদ নয়। এটি একটি কঠিন সতর্কবার্তা। কারণ প্রকৃতিকে ধ্বংস করে মানুষ নিরাপদ থাকতে পারে না।
নদীকে বন্দী করে শহরকে বাঁচানো যায় না।
পাহাড়কে ক্ষতবিক্ষত করে উন্নয়ন টেকসই হয় না।
আর পৃথিবীকে উত্তপ্ত করে ভবিষ্যৎকে শীতল রাখা যায় না।
আজকের বন্যা হয়তো প্রকৃতির অভিশাপ নয়।
কিন্তু মানুষের তৈরি ক্ষতের বিরুদ্ধে প্রকৃতির প্রতিক্রিয়া নিঃসন্দেহে।
আর সবচেয়ে ভয়ংকর সত্য হলো, আমরা যদি এখনই এই সতর্কবার্তা না বুঝি, তাহলে আগামী দিনের দুর্যোগগুলো হয়তো আরও ভয়াবহ ভাষায় আমাদের সেই শিক্ষা দেবে।

