বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বিক্রি ঘিরে বাংলাবাজারে বিক্রয়কেন্দ্রে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া এবং দুই কর্মীকে আটকে রাখার অভিযোগ তুলেছে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান দ্য ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল)। আজ মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) এক বিবৃতিতে প্রতিষ্ঠানটি এ ঘটনার প্রতিবাদ জানায়। ইউপিএলের দাবি, বইটি সরকার বা আদালত কোনো পক্ষই নিষিদ্ধ করেনি। তবে ঘটনার অন্য পক্ষের বক্তব্য এখনো পাওয়া যায়নি।
ইউপিএল জানায়, সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে বাংলাবাজারের শোরুমে কয়েকজন ব্যক্তি আক্রমণাত্মক আচরণ করেন। তাঁরা বইটিকে বেআইনিভাবে নিষিদ্ধ বলে দাবি করে বিক্রি বন্ধের চাপ দেন। প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য অনুযায়ী, একপর্যায়ে তাঁরা দোকানের শাটার নামিয়ে দেন এবং দুই বিক্রয়কর্মীকে হয়রানি করেন। পরে কর্মী দুজনকে ফরিদাবাদ পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে আটকে রাখা হয়। পরে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলেও বিবৃতিতে জানানো হয়েছে।
ঘটনার আরেকটি বিবরণও প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে বলা হয়, সোমবার বিকেলে দুই তরুণ বিক্রয়কেন্দ্রে গিয়ে বইটি কিনতে চান। বই বের করে দেওয়ার পর তাঁরা নিষিদ্ধ বই বিক্রির অভিযোগ তুলে লোক জড়ো করেন। এরপর বিক্রয়কেন্দ্রে তালা লাগানো হয় এবং একই সময়ে দুই কর্মীকে আটক করা হয়।
সূত্রাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মতিউর রহমান সংবাদমাধ্যমকে জানান, ওই দুজনকে থানায় নেওয়া হয়নি। তাঁদের ফরিদাবাদ পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং সেখান থেকেই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
বই নিষিদ্ধ প্রসঙ্গে ইউপিএলের অবস্থান স্পষ্ট। প্রতিষ্ঠানটির বক্তব্য, কোনো বই নিষিদ্ধ করতে হলে নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া মানতে হয়। এই বইয়ের ক্ষেত্রে তেমন কিছু ঘটেছে বলে তাদের জানা নেই। কোনো দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ আইন মেনে নিষিদ্ধ করলে তারা যথাযথ ব্যবস্থা নেবে।
বিবৃতিতে ইউপিএল আরও বলেছে, অতীতেও তারা নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসেনি। প্রতিষ্ঠানটি কয়েকটি উদাহরণ দিয়েছে। আগের সরকারের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট থেকে ক্ষমা চাইতে বলা, মওদুদ আহমদের গ্রন্থাবলি নিয়ে চাপ এবং অধ্যাপক আসিফ নজরুলের গঙ্গা চুক্তিবিষয়ক বই নিয়ে ঘটনা তাতে আছে। সম্প্রতি ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের জামায়াতে ইসলামীর ইতিহাসবিষয়ক বই এবং আগের আমলে বইমেলায় আদর্শ প্রকাশনীর বই বন্ধ করার ঘটনাতেও তারা একইভাবে প্রতিবাদ করেছে বলে দাবি করেছে। ইউপিএল জানায়, স্বাধীন পর্যালোচকদের মতামত নিয়ে মান বজায় রেখেই প্রতিটি বই প্রকাশ করা হয়। অন্যায্য চাপের মুখে বই তুলে নেওয়ার ইতিহাস তাদের নেই।
এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আইনি অবস্থান নিয়ে। বই নিষিদ্ধ করা একটি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া, যেখানে সরকারি প্রজ্ঞাপন বা আদালতের আদেশ লাগে। ইউপিএল বলছে, তেমন কিছু হয়নি। যাঁরা বিক্রি বন্ধের চাপ দিয়েছেন বলে অভিযোগ, তাঁরা কোন ভিত্তিতে বইটিকে নিষিদ্ধ বলছিলেন, সেটি প্রতিবেদনে নেই। এমন কোনো সরকারি আদেশ আছে কি না, সে বিষয়ে সরকারের কোনো ব্যাখ্যাও আসেনি। তাই বইটির আইনগত অবস্থা নিয়ে কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট বক্তব্য জরুরি। এটি জানা না গেলে বিক্রেতা, ক্রেতা ও পুলিশ, সবার কাছেই বিষয়টি অস্পষ্ট থেকে যায়।
ঘটনার বিবরণে দুই পক্ষের পার্থক্যও লক্ষণীয়। ইউপিএল বলছে, কয়েকজন ব্যক্তি এসে আক্রমণাত্মক আচরণ করেছেন। অন্য বিবরণে দুই তরুণ ক্রেতা সেজে এসে পরে অভিযোগ তুলেছেন বলে এসেছে। দুই বিবরণ পুরোপুরি বিপরীত নয়, তবে ঠিক কতজন ছিলেন, তাঁদের কী উদ্দেশ্য ছিল এবং কারা তাঁদের পাঠিয়েছে কি না, এসব প্রশ্নের উত্তর নেই। তাঁদের নিজস্ব বক্তব্যও প্রতিবেদনে আসেনি। তাই ঘটনাটিকে ইউপিএলের ভাষ্য এবং একটি পরোক্ষ বিবরণের ভিত্তিতে বোঝা যাচ্ছে, স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য নেই।
আরেকটি প্রশ্ন দুই কর্মীকে আটকের বিষয়ে। ওসি জানিয়েছেন, তাঁদের থানায় আনা হয়নি, পুলিশ ফাঁড়িতে নেওয়া হয়েছিল এবং সেখান থেকেই ছেড়ে দেওয়া হয়। এতে একটি ব্যাপার নিশ্চিত হয়: পুলিশ ফাঁড়িতে দুজনকে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কে বা কারা তাঁদের সেখানে নিয়ে গেছে, কোন কারণে এবং কতক্ষণ রাখা হয়েছিল, প্রতিবেদনে তা বলা নেই। ইউপিএল বলছে, তাঁদের আটকে রাখা হয়েছিল। ওসির বক্তব্যে ‘আটক’ শব্দটি নেই। পুলিশ তাঁদের আইনি ভিত্তিতে নিয়েছিল, নাকি অভিযোগকারীদের চাপে, সেটি জানা যায়নি। থানায় নেওয়া হয়নি, এই তথ্যের মানে হতে পারে সেখানে কোনো আনুষ্ঠানিক নথি হয়নি। তবে এটি একটি অনুমান, প্রতিবেদন থেকে নিশ্চিত করা যায় না।
ইউপিএলের অতীত ঘটনার তালিকাটিও খেয়াল করার মতো। প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থানের লেখক ও বিষয়ের বইয়ের পক্ষে দাঁড়ানোর কথা বলেছে। এর মধ্যে আগের সরকারের সময়ের ঘটনার পাশাপাশি সাম্প্রতিক ঘটনাও আছে। এভাবে তারা বোঝাতে চাইছে, চাপের মুখে অবস্থান বদলানো তাদের নীতি নয়, এবং আজকের প্রতিবাদও কোনো একটি রাজনৈতিক পক্ষের প্রতি ঝোঁক থেকে নয়। এটি ইউপিএলের নিজের দাবি। প্রতিটি ঘটনার বিবরণ ও ফল স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি। তবু এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, প্রতিষ্ঠানটি ঘটনাটিকে একটি বিশেষ বইয়ের প্রশ্নের চেয়ে প্রকাশনার স্বাধীনতার বিস্তৃত প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে।
এই ঘটনার একটি বাস্তব দিক আছে বিক্রয়কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে। একটি বইয়ের বিক্রয়কেন্দ্রে কয়েকজন ব্যক্তি গিয়ে চাপ দিলেন, দোকান বন্ধ করালেন এবং কর্মীদের আটকে রাখা হলো, এটি সত্য হলে সেটি বই বিক্রির স্বাধীনতার পাশাপাশি সাধারণ কর্মীদের নিরাপত্তার প্রশ্নও তোলে। প্রকাশনা ও বই বিক্রির ব্যবসায় যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের ওপর এমন চাপ ছড়িয়ে পড়লে অন্য বিক্রেতারাও ঝুঁকি এড়াতে কিছু বই তাকে না রাখার দিকে যেতে পারেন। এতে পাঠকের পছন্দের সুযোগ কমে যায়। তবে এই আশঙ্কা এক ঘটনা থেকে প্রমাণিত সত্য নয়, একটি সম্ভাব্য পরিণতির কথা।
এ পর্যন্ত যা জানা গেছে, তা মূলত তিন পক্ষের বক্তব্য থেকে এসেছে। ইউপিএলের বিবৃতি, একটি পরোক্ষ ঘটনাবিবরণ এবং সূত্রাপুর থানার ওসির মন্তব্য। যেসব ব্যক্তি বিক্রি বন্ধের চাপ দিয়েছেন বলে অভিযোগ, তাঁদের পরিচয়, বক্তব্য ও উদ্দেশ্য অজানা। ফরিদাবাদ পুলিশ ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বক্তব্যও নেই। কোনো মামলা বা অভিযোগ দায়ের হয়েছে কি না, সে তথ্যও নেই। সরকার বা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কোনো প্রতিক্রিয়াও পাওয়া যায়নি।
সব মিলিয়ে ঘটনাটি একটি বই বিক্রি ঘিরে তৈরি হওয়া বিরোধ, যার আইনি ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন আছে এবং যেখানে পুলিশের ভূমিকাও স্পষ্ট নয়। সামনে কয়েকটি বিষয় নজরে রাখতে হবে। প্রথমত, বইটির আইনি অবস্থা নিয়ে সরকার বা আদালতের কোনো ব্যাখ্যা আসে কি না। দ্বিতীয়ত, দুই কর্মীকে ফাঁড়িতে নেওয়ার কারণ ও প্রক্রিয়া নিয়ে পুলিশের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য আসে কি না। তৃতীয়ত, ইউপিএল বইটি বিক্রি চালিয়ে যায় কি না এবং কোনো আইনি পদক্ষেপ নেয় কি না। এই তিনটি উত্তর মিললেই বোঝা যাবে, ঘটনাটি একটি বিচ্ছিন্ন বিরোধ ছিল, নাকি বই প্রকাশ ও বিক্রির স্বাধীনতা নিয়ে বৃহত্তর বিতর্কের অংশ।

