চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে কৃষি ও পল্লী খাতে ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে ৬০ হাজার কোটি টাকা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই ঋণের আওতায় ডেইরি ও পোল্ট্রি খামার, কৃষিপণ্য সংরক্ষণ এবং গ্রামীণ অর্থনীতির বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অর্থায়নের সুযোগ থাকবে।
রোববার জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মোছা. ফরিদা ইয়াসমিনের লিখিত প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের মাধ্যমে এই ঋণ বিতরণ করা হবে। হিমাগার বা গুদামে সংরক্ষিত কৃষিপণ্যের বিপরীতে ঋণ নেওয়ার পাশাপাশি ডেইরি ও পোল্ট্রি ফার্ম প্রতিষ্ঠার জন্যও ব্যাংকঋণের সুযোগ রয়েছে।
তবে ৬০ হাজার কোটি টাকার পুরো অর্থ শুধু এই তিন খাতে যাবে, বিষয়টি এমন নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের কৃষি ও পল্লী ঋণ নীতিমালায় মোট লক্ষ্যমাত্রা ৬০ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের ৩৯ হাজার কোটি টাকার তুলনায় ২১ হাজার কোটি টাকা বা ৫৩ দশমিক ৮৫ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর জন্য ২০ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা এবং বেসরকারি ও বিদেশি ব্যাংকের জন্য ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এবারের নীতিমালায় কৃষিতে ব্যাংকঋণের প্রবাহ বাড়ানোর জন্য ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের অন্তত ৪ শতাংশ কৃষি খাতে দেওয়ার নির্দেশনাও এসেছে, যেখানে আগের ন্যূনতম হার ছিল ২ দশমিক ৫ শতাংশ। একই সঙ্গে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে জামানতবিহীন ঋণের পরিধি বাড়ানো হয়েছে। ফলে গবাদিপশু, মাছ ও পোল্ট্রি খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংকঋণের সুযোগ আগের তুলনায় কিছুটা বিস্তৃত হওয়ার কথা।
এই ঋণপ্রবাহের গুরুত্ব শুধু কৃষকের হাতে টাকা পৌঁছানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কৃষিপণ্যের উৎপাদন বাড়লেও সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণে দুর্বলতা থাকলে মৌসুমে দাম পড়ে যেতে পারে, আবার সংরক্ষণের অভাবে পণ্য নষ্ট হলে কৃষকও ক্ষতিগ্রস্ত হন। সে কারণে আধুনিক হিমাগার, গুদাম, পরিবহন ও অন্যান্য অবকাঠামোয় অর্থায়ন বাড়ানো হলে কৃষি উৎপাদনের সঙ্গে বাজারব্যবস্থার সংযোগও শক্তিশালী হতে পারে। অর্থাৎ ঋণটি যদি উৎপাদনের পাশাপাশি কৃষির মূল্য শৃঙ্খলের দুর্বল জায়গাগুলোতে পৌঁছায়, তাহলে এর প্রভাব শুধু কৃষক নয়, খাদ্য সরবরাহ ও গ্রামীণ ব্যবসাতেও পড়তে পারে।
এর বাইরে উত্তরবঙ্গকে কৃষিভিত্তিক অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে বাংলাদেশ ব্যাংক ৩ হাজার কোটি টাকার একটি পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করেছে। ৬ জুলাইয়ের এ সংক্রান্ত সার্কুলারে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব হিমাগার নির্মাণের পাশাপাশি শস্য-ফসল, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, কৃষি ও সেচ যন্ত্রপাতি এবং আয় উৎসারী কর্মকাণ্ডে অর্থায়নের সুযোগ রাখা হয়েছে। অর্থাৎ উত্তরবঙ্গের ক্ষেত্রে লক্ষ্যটি শুধু কৃষিঋণ বিতরণ নয়; উৎপাদন, সংরক্ষণ ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসাকে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা।
আর এখানেই বড় প্রশ্নটি হলো, ৬০ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকরভাবে মাঠে পৌঁছাবে। কৃষিঋণের বড় অঙ্ক ঘোষণা করাই যথেষ্ট নয়; প্রকৃত কৃষক ও উদ্যোক্তার কাছে সময়মতো অর্থ পৌঁছানো, ঋণের অর্থ নির্ধারিত কাজে ব্যবহার এবং পরে সেই ঋণ আদায়; তিনটিই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ব্যাংক এবার লক্ষ্য বাড়ানোর পাশাপাশি ঋণ বিতরণে ব্যাংকগুলোর ওপর নজরদারির কথাও জানিয়েছে। ফলে এই বিশাল ঋণ কর্মসূচির সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে টাকার পরিমাণের চেয়ে তার ব্যবহার কতটা সঠিকভাবে হচ্ছে তার ওপর।
৬০ হাজার কোটি টাকার এই উদ্যোগ তাই শুধু একটি ঋণ লক্ষ্যমাত্রা নয়; কৃষি উৎপাদন থেকে সংরক্ষণ, খামার থেকে বাজার; পুরো গ্রামীণ অর্থনীতিতে ব্যাংকঋণের প্রবাহ বাড়ানোর একটি বড় পরিকল্পনা। এখন দেখার বিষয়, সেই অর্থ কাগজের লক্ষ্যমাত্রা পেরিয়ে বাস্তবে কতটা পরিবর্তন আনতে পারে।

