আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানিয়েছেন, তাঁর অনুপস্থিতিতে দলের সভাপতির দায়িত্ব সামলাবেন প্রেসিডিয়ামের সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম। ভারতীয় গণমাধ্যম দ্য ওয়ালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এই তথ্য জানান।
দ্য ওয়ালের নির্বাহী সম্পাদকের সঙ্গে দীর্ঘ এই আলাপচারিতায় দেশে ফেরার পরিকল্পনা, নিজের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা, বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুই দেশের সম্পর্ক এবং দলের আগামী নেতৃত্ব নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন তিনি। এ ছাড়া ছোট বোন শেখ রেহানা সরাসরি রাজনীতিতে সক্রিয় নন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
সাক্ষাৎকারে দেশে ফেরার আগের অবস্থানই আবার তুলে ধরেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী—আসছে ডিসেম্বরেই দেশে ফিরবেন বলে তিনি জানান। বিজয়ের মাস হওয়ায় সচেতনভাবেই তিনি এই সময়টি বেছে নিয়েছেন বলে জানান। একই সঙ্গে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, দেশে ফিরলে বিমানবন্দরেই তাঁর জীবনের ওপর হামলার ঝুঁকি থাকতে পারে। তবে নিজের কারণে অন্য কারও জীবন বিপন্ন হোক, তা তিনি চান না বলে জানান। দেশে ফেরার প্রস্তুতি হিসেবে তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলার কথাও জানান তিনি।
বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক উগ্রপন্থার প্রভাব বাড়ছে বলে দাবি করেন শেখ হাসিনা, এবং এর নেতিবাচক প্রভাব শুধু বাংলাদেশেই সীমাবদ্ধ থাকবে না বরং প্রতিবেশী ভারতকেও এর মাশুল গুনতে হতে পারে বলে মন্তব্য করেন। তাঁর ভাষ্যে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্যও উদ্বেগের কারণ হতে পারে, তাই দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক সমঝোতা ও সহযোগিতা জরুরি বলে তিনি মনে করেন।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক নির্বাচন প্রক্রিয়ায় ভারতের সমর্থন এবং বিএনপি নেতা তারেক রহমানের দেশে প্রত্যাবর্তনে নয়াদিল্লির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি, যদিও এ বিষয়ে সরাসরি কোনো ব্যাখ্যা দেননি। তারেক রহমানের বিদেশে থেকে রাজনীতি পরিচালনার সমালোচনা করেন তিনি, পাশাপাশি নিজের বিরুদ্ধে অনুরূপ অভিযোগের জবাবও দেন। তারেক রহমানের ভারত সফর ঘিরে দর-কষাকষিকে বাংলাদেশের জন্য সম্মানজনক নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলার সময় বেশ আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন সাবেক এই সরকারপ্রধান। দেশের চলমান অবস্থা তাঁকে গভীরভাবে পীড়া দিচ্ছে বলে জানান তিনি।
দেশে ফেরার জন্য প্রয়োজনীয় ভ্রমণ নথি না পেলে কী করবেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি নিজের রাজনৈতিক ও পারিবারিক ইতিহাস তুলে ধরে দেশে ফেরার অধিকারের প্রশ্ন তোলেন। বর্তমান সরকার তাঁকে ভারতের কাছে ফেরত চাইছে বলে দাবি করে তিনি বলেন, প্রয়োজনে নিজ উদ্যোগেই তিনি দেশে ফিরবেন। বিকল্প কোনো পথে প্রবেশের সম্ভাবনা নিয়ে তিনি সরাসরি কিছু না বলে জানান, পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কড়া সমালোচনা করেন শেখ হাসিনা এবং দেশের বিরাজমান পরিস্থিতিকে পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র হিসেবে আখ্যা দেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নিয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। জনগণের পাশে দাঁড়ানোর প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি বলেন, প্রয়োজনে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হলেও তিনি মানুষের কাছে ফিরে যেতে চান।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণভবন ছেড়ে ভারতে যাওয়ার প্রসঙ্গ তুলে তিনি জানান, দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত তাঁর নিজের ইচ্ছায় ছিল না এবং তৎকালীন পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি আগে থেকে অবগত ছিলেন না বলে দাবি করেন। তাঁর ভাষ্যমতে, তিনি প্রাথমিকভাবে ধারণা করেছিলেন তাঁকে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় নেওয়া হচ্ছে, তবে হেলিকপ্টারে সীমান্ত অতিক্রমের পর জানতে পারেন যে তিনি ভারতে যাচ্ছেন।
আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে বিপুলসংখ্যক মামলা দায়েরের অভিযোগও তোলেন তিনি, দাবি করেন প্রায় ছয় লাখ মামলা হয়েছে তাঁর দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে। পাশাপাশি সরকার কারাগারে থাকা জঙ্গি ও সন্ত্রাসীদের মুক্তি দিয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন থানায় হামলা, অগ্নিসংযোগ এবং দলীয় নেতা-কর্মী ও পুলিশ সদস্যদের ওপর সহিংসতার ঘটনার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
উল্লেখ্য, সাক্ষাৎকারে তুলে ধরা এসব বক্তব্য ও অভিযোগ সম্পূর্ণভাবে শেখ হাসিনার নিজস্ব বক্তব্য ও দাবি, যা তিনি ওই সাক্ষাৎকারে তুলে ধরেছেন।

