দেশের দ্রুত বিকাশমান পর্যটন ও হসপিটালিটি খাতে দক্ষ জনবলের ঘাটতি পূরণে কক্সবাজারে একটি বড় প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে কক্সবাজারের মোটেল লাবণী প্রাঙ্গণে প্রায় ২৭৫ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি আধুনিক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় ‘মোটেল লাবণী কম্পাউন্ড, কক্সবাজারে প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট স্থাপন’ শীর্ষক একটি প্রকল্প প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে। অনুমোদন পাওয়া গেলে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন চলতি বছর থেকে ২০২৯ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে।
প্রস্তাবিত প্রতিষ্ঠানটি শুধু প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নয়, একই সঙ্গে একটি হোটেল ও প্রশিক্ষণ সুবিধা সমন্বিত একটি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা হবে। এর ফলে প্রশিক্ষণার্থীরা শুধু শ্রেণিকক্ষে শিক্ষা নয়, বাস্তব পরিবেশে কাজের অভিজ্ঞতাও অর্জন করতে পারবেন। বর্তমানে পর্যটন খাতের বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের জন্য অনেককে ঢাকায় যেতে হয়, নতুন এই প্রতিষ্ঠান চালু হলে সেই প্রয়োজন কমবে।
বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের পরিকল্পনা, পরিসংখ্যান ও প্রশিক্ষণ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মো. জিয়াউল হক হাওলাদার বলেন, কক্সবাজার বর্তমানে দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এখানে প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০টি হোটেল ও মোটেল রয়েছে, কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানে কাজ করার মতো প্রশিক্ষিত কর্মীর সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।
তিনি বলেন, পর্যটন শিল্পের সম্প্রসারণের সঙ্গে দক্ষ কর্মীর চাহিদা বাড়ছে। এই ঘাটতি পূরণ করতেই আধুনিক প্রশিক্ষণ সুবিধা তৈরি করা হচ্ছে।
প্রস্তাবিত প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটটি বর্তমান মোটেল লাবণী প্রাঙ্গণের প্রায় ৩ দশমিক ৪৫ একর জায়গায় নির্মাণ করা হবে। বর্তমানে সেখানে থাকা স্থাপনাগুলো অনেকটাই জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
নতুন প্রতিষ্ঠানে পর্যটন খাতের বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এর মধ্যে রয়েছে হোটেলের ফ্রন্ট অফিস পরিচালনা, হাউসকিপিং ও লন্ড্রি ব্যবস্থাপনা, ট্রাভেল ও ট্যুর অপারেশন, বিমান ও এয়ারলাইন টিকিটিং, খাবার প্রস্তুত ও পরিবেশন এবং বেকারি ও পেস্ট্রি বিষয়ক প্রশিক্ষণ।
বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের নিজস্ব প্রশিক্ষকেরাই এসব কোর্স পরিচালনা করবেন। প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে হোটেল সুবিধার মধ্যেই হাতে-কলমে কাজ শেখার সুযোগ থাকবে।
প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রকল্পের আওতায় দুটি ভবন নির্মাণের কথা রয়েছে। এর মধ্যে একটি হবে ১৫ তলা হোটেল ভবন এবং অন্যটি হবে ১০ তলা প্রশিক্ষণ ও শিক্ষার্থী আবাসন ভবন। যদিও ভবনের নকশা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ধারণা করা হচ্ছে, এই প্রতিষ্ঠান থেকে বছরে প্রায় ৮০০ থেকে ৯০০ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব হবে।
পর্যটন খাতের উদ্যোক্তা ও সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দক্ষ জনবলের অভাব বর্তমানে দেশের পর্যটন শিল্পের অন্যতম বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) সভাপতি মোহাম্মদ হানিফ বলেন, পর্যটনসংশ্লিষ্ট সেবায় দক্ষ কর্মীর সংকট অত্যন্ত গুরুতর। পর্যটন পেশাজীবী, ট্যুর গাইড ও অপারেটর তৈরির জন্য দেশে পর্যাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা নেই। তিনি মনে করেন, এমন উদ্যোগ আরও আগেই নেওয়া প্রয়োজন ছিল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নুসরাত জাহান বলেন, পর্যটন খাতে কর্মীদের শুধু কারিগরি দক্ষতা নয়, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ ও আচরণগত দক্ষতাও প্রয়োজন। পর্যটকদের ভালো সেবা দিতে যোগাযোগ দক্ষতা, ভদ্রতা ও সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, প্রশিক্ষণ কার্যক্রমকে হোটেল, রেস্টুরেন্ট, এয়ারলাইন, ট্রাভেল এজেন্সি ও ট্যুর অপারেটরসহ পুরো পর্যটন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
এদিকে কক্সবাজারকে আরও আকর্ষণীয় পর্যটন গন্তব্য হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার আরও বড় পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন মোটেল লাবণী ও হোটেল শৈবাল এলাকায় সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে বিভিন্ন পর্যটন সুবিধা তৈরির পরিকল্পনা করছে।
এসব সুবিধার মধ্যে থাকবে বিনোদন কেন্দ্র, ফুড জোন, শপিং আউটলেট, সিনেপ্লেক্স, সুইমিং ও ওয়াটার অ্যাক্টিভিটি, জিম ও স্পা, অ্যাকুয়ারিয়াম, গেম জোন এবং হস্তশিল্প ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের স্থান। এসব উদ্যোগের লক্ষ্য হলো পর্যটকদের শুধু সমুদ্রসৈকত ঘুরে ফিরে না গিয়ে কক্সবাজারে আরও বেশি সময় অবস্থান করতে উৎসাহিত করা।
এই বৃহৎ উন্নয়ন পরিকল্পনার বিস্তারিত সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে জমির ব্যবহার, নকশা, বিনিয়োগ প্রয়োজন, ব্যবসায়িক সম্ভাবনা ও ঝুঁকি বিশ্লেষণ করা হবে। প্রাথমিকভাবে এই উন্নয়ন প্রকল্পে প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে পর্যটন খাতের উন্নয়নে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। টোয়াব সভাপতি মোহাম্মদ হানিফ বলেন, বিদেশি পর্যটক আকর্ষণে সহজ ভিসা ব্যবস্থা, ই-ভিসা ও অন-অ্যারাইভাল ভিসার সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি কক্সবাজার, সুন্দরবন, পাহাড়, বনাঞ্চল ও ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলোকে আন্তর্জাতিকভাবে প্রচার করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষ জনবল তৈরি ও পর্যটন অবকাঠামোর উন্নয়ন একসঙ্গে এগিয়ে নিতে পারলে কক্সবাজার শুধু দেশের নয়, আন্তর্জাতিক পর্যটন মানচিত্রেও আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে।

