চট্টগ্রাম বন্দরের ইয়ার্ডে জমে থাকা পণ্যই এখন সরকারের জন্য আয়ের বড় উৎস হয়ে উঠেছে। ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সাড়ে পাঁচ বছরে অনলাইন ও প্রকাশ্য নিলামের মাধ্যমে পণ্য বিক্রি করে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা রাজস্ব আয় করেছে চট্টগ্রাম কাস্টমস। এককথায়, বন্দরে আটকে পড়া পণ্যগুলোকে কাজে লাগিয়ে বাড়তি রাজস্ব আহরণের যে উদ্যোগ, তা ধীরে ধীরে সাফল্য পাচ্ছে।
এই মোট আয়ের একটা বড় অংশ এসেছে গত দেড় বছরে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত মাত্র ১৮ মাসে আয় হয়েছে ২৮৫ কোটি ১৫ লাখ টাকা। চট্টগ্রাম কাস্টমসের নিলাম শাখার সহকারী কমিশনার আবু সুফিয়ান বলেছেন, গত কয়েক বছরে নিলামের সংখ্যা বাড়ায় রাজস্ব আয়ও বেড়েছে। আর কেএম কর্পোরেশনের ম্যানেজার মোহাম্মদ মোর্শেদ এই অর্জনকে ‘রেকর্ড’ আখ্যা দিয়েছেন।
বছরভিত্তিক পরিসংখ্যান দেখলে চিত্রটি আরও স্পষ্ট হয়। ২০২১ সালে ২৪টি নিলামে ১ হাজার ৮১৪ লট পণ্য বিক্রি করে আয় হয় ১১৫ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। ২০২২ সালে ৪২টি নিলামে ১ হাজার ৩৮১ লট থেকে আয় হয় ১৩০ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। ২০২৩ সালে আয় কমে দাঁড়ায় ৪১ কোটি ১৩ লাখ টাকায়। ২০২৪ সালে ৫৫টি নিলামে মাত্র ২৭ কোটি ২৯ লাখ টাকা আয় হয়। কিন্তু ২০২৫ সালে আবার গতি ফেরে—৬০টি নিলামে ১ হাজার ৪০ লট পণ্য বিক্রি করে আয় হয় ১২৭ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। আর ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ৪৫টি নিলামে ৩৮৩ লট থেকে আয় হয়েছে ১৫৭ কোটি ৪৮ লাখ টাকা।
কেন এই নিলামের পরিমাণ বাড়ল? মূল কারণ চট্টগ্রাম বন্দরে দীর্ঘদিন জমে থাকা কনটেইনার। আমদানিকারকরা অনেক সময় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য খালাস না করলে বা শুল্ক ফাঁকি দিয়ে পণ্য আমদানি করলে সেগুলো জব্দ হয়। এরপর ৩০ দিনের নোটিশ দেওয়া হয়; যদি কেউ পণ্য না নেয়, তাহলে সেগুলো নিলামে তোলা হয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) দীর্ঘদিন পড়ে থাকা কনটেইনার খালাস করতে নিলামযোগ্য পণ্য বিক্রি এবং অযোগ্য পণ্য ধ্বংসের বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। আর অনলাইন নিলাম চালু হওয়ায় প্রক্রিয়াটি আরও দ্রুত ও স্বচ্ছ হয়েছে।
শুধু রাজস্ব আয়ই নয়, এই উদ্যোগের আরেকটি বড় সুবিধা হলো বন্দর ইয়ার্ড খালি হওয়া। এর আগে জানুয়ারি ২০২৬ সালে চট্টগ্রাম কাস্টমস ইতিহাসের সবচেয়ে বড় নিলাম সম্পন্ন করে, প্রায় ২ হাজার ৮০০ টন অখালাসকৃত পণ্য ই-নিলামে বিক্রি হয়। ওই একক নিলামে আয় হয় ১১ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। চট্টগ্রাম বন্দরে এখনও নিলামের অপেক্ষায় রয়েছে হাজার হাজার কনটেইনার। প্রতি মাসে উন্মুক্ত নিলামের মাধ্যমে ২০-৩০টি কনটেইনারের পণ্য বিক্রি হচ্ছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে যেমন রাজস্ব বাড়বে, তেমনি বন্দরের সক্ষমতাও বাড়বে। আটকে পড়া পণ্যই যখন সরকারের জন্য আয়ের নতুন দিগন্ত খুলে দিচ্ছে, তখন এই উদ্যোগকে আরও গতিশীল করাই এখন সময়ের দাবি।

