বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের চাহিদা দ্রুত বাড়লেও সেই অনুপাতে নতুন সক্ষমতা তৈরি হচ্ছে না। ২০১৫ সালে দেশে ব্যান্ডউইথের চাহিদা ছিল ১৪১ গিগাবিট প্রতি সেকেন্ড (জিবিপিএস)। ২০২৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩ দশমিক ৫ টেরাবিট প্রতি সেকেন্ডে (টিবিপিএস)। পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৮ সালে চাহিদা ২৭ টিবিপিএস এবং ২০৩০ সালে ৫৪ টিবিপিএসে পৌঁছাতে পারে।
চাহিদা বাড়ার এই প্রবণতা বেশ কয়েক বছর ধরেই চলছে। কিন্তু নতুন সাবমেরিন কেবল ও বিকল্প আন্তর্জাতিক সংযোগ তৈরির ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা কাটছে না। সরকারি নতুন কেবল প্রকল্পও দীর্ঘদিন ধরে আটকে আছে। বেসরকারি খাতের একটি প্রকল্পে রুট জরিপ, বিনিয়োগ, কেবল ও কারিগরি সরঞ্জাম তৈরির কাজ শেষ হলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় এখনো চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়া যায়নি।
ফলে আগামী কয়েক বছরে প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত ব্যান্ডউইথ কোথা থেকে আসবে, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সংযোগের প্রধান ভিত্তি দুটি সাবমেরিন কেবল। এর একটি বেশ পুরোনো, আর অন্যটির ব্যবহারযোগ্য সক্ষমতার বড় অংশ ইতোমধ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে।
নতুন সাবমেরিন কেবল যুক্ত না হলে বাড়তি চাহিদা মেটাতে স্থলপথে, বিশেষ করে ভারতের ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা আরও বাড়তে পারে। বর্তমানে দেশের অর্ধেকের বেশি ব্যান্ডউইথ ভারত হয়ে আসে।
গত ১১ বছরে বাংলাদেশে ব্যান্ডউইথের চাহিদা বেড়েছে ৯৫ গুণের বেশি। বর্তমানে দেশের মোট আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট ট্রাফিক প্রায় ১২ দশমিক ১ টিবিপিএস।
খাতসংশ্লিষ্টদের হিসাবে, গত কয়েক দশকে দেশে ব্যান্ডউইথের ব্যবহার বছরে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ হারে বেড়েছে। অর্থাৎ প্রায় আড়াই বছরেই চাহিদা দ্বিগুণ হচ্ছে।
এই প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালে প্রয়োজন হতে পারে ৫৪ টিবিপিএস ব্যান্ডউইথ। দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে ২০৩২ সালে চাহিদা ১০৮ টিবিপিএস, ২০৩৪ সালে ২১৬ টিবিপিএস এবং ২০৩৫ সালে ৩০৫ টিবিপিএস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের প্রধান উৎস বর্তমানে সি-মি-উই-৪ ও সি-মি-উই-৫। দুটি কেবলের নকশাগত সক্ষমতা যথাক্রমে ৪ দশমিক ৬ ও ২ দশমিক ৫ টিবিপিএস। তবে নকশাগত সক্ষমতা এবং বাস্তবে ব্যবহারযোগ্য বা লিটআপ সক্ষমতা এক নয়।
সি-মি-উই-৪ বাংলাদেশে যুক্ত হয় ২০০৫ সালে। কেবলটির প্রাথমিক পরিকল্পিত আয়ুষ্কাল ছিল ২০ বছর। পরে এর কার্যকাল বাড়ানোর ব্যবস্থা করা হলেও পুরোনো অবকাঠামোর কারণে কেবলটির দক্ষতা কমেছে।
সি-মি-উই-৫-এর লিটআপ সক্ষমতা প্রায় ২ দশমিক ২ টিবিপিএস। এর মধ্যে ১ দশমিক ৪৮৮ টিবিপিএস বর্তমানে ব্যবহার হচ্ছে। অব্যবহৃত রয়েছে প্রায় ৭১২ জিবিপিএস। ফলে দ্রুত বাড়তে থাকা চাহিদার তুলনায় এই অতিরিক্ত সক্ষমতা খুব বেশি নয়।
আন্তর্জাতিক সাবমেরিন কেবল সংযোগের বৈচিত্র্যেও বাংলাদেশ পিছিয়ে রয়েছে। বর্তমানে দেশের সঙ্গে দুটি প্রধান সাবমেরিন কেবল যুক্ত রয়েছে।
অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে ১৯টি, মালয়েশিয়ার সঙ্গে ২৩টি এবং থাইল্যান্ডের সঙ্গে ১২টি সাবমেরিন কেবল সংযোগ রয়েছে। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ডের মতো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোও একাধিক সাবমেরিন কেবল রুট তৈরি করেছে।
ফলে কোনো একটি কেবল বা রুটে সমস্যা হলে এসব দেশের বিকল্প সংযোগ ব্যবহারের সুযোগ বেশি। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেই সুযোগ তুলনামূলকভাবে সীমিত।নতুন সক্ষমতা তৈরিতে বেসরকারি খাতের একটি বড় প্রকল্পও নানা জটিলতায় আটকে আছে।
২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে বিটিআরসি সামিট কমিউনিকেশনস, সিডিনেট কমিউনিকেশনস ও মেটাকোর সাবকমকে সাবমেরিন কেবল স্থাপন, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের লাইসেন্স দেয়। তিন প্রতিষ্ঠান মিলে বিপিসিএস কনসোর্টিয়াম গঠন করে।
২০২৪ সালের শুরুতেই প্রকল্পটির রুট জরিপ শেষ হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৬ সালের শেষ দিকে কেবল স্থাপন এবং ২০২৭ সালের মাঝামাঝি বাণিজ্যিক সেবা চালুর কথা রয়েছে।
প্রকল্পটির ব্যয় প্রায় ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। কেবল স্থাপনের জন্য বিদেশি খরচ মেটাতে প্রয়োজন ৪ কোটি ২০ লাখ ডলার। এর মধ্যে ৩ কোটি ২০ লাখ ডলার ইতোমধ্যে পরিশোধ করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, নৌপরিবহন, প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র ও পরিবেশসহ বিভিন্ন দপ্তরের অনুমোদনও পাওয়া গেছে। সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ থেকেও ছাড়পত্র নেওয়া হয়েছে। তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও এনএসআইয়ের ছাড়পত্র নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে।
গত ৬ জুলাই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ‘সিএস ব্লু নেভিগেটর’ ও ‘এনডেভার’ জাহাজ দুটিকে অন্যান্য অনুমোদন সাপেক্ষে বাংলাদেশের জলসীমায় প্রবেশের অনাপত্তি দেয়। এরপর ১২ জুলাই ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়কে না জানিয়ে চিঠি দেওয়ায় বিটিআরসির কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়।
২৯ জুলাই এনএসআইকে দেওয়া এক চিঠিতে মন্ত্রণালয়ের অগ্রায়ন ছাড়া বেসরকারি সাবমেরিন কেবল স্থাপনের অনুমোদন না দেওয়ার কথা বলা হয়। ৩০ জুলাই কনসোর্টিয়াম গঠনে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছিল কি না, তা নিয়েও বিটিআরসির কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়।
প্রকল্পটির সঙ্গে ভূরাজনৈতিক ও নিরাপত্তার বিষয়ও যুক্ত হয়েছে। প্রকল্পের প্রধান ঠিকাদার চীনভিত্তিক এইচএমএন টেক হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তি রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য।
চীনা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কেবল স্থাপনের ক্ষেত্রে তথ্য নিরাপত্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের কাছে উদ্বেগ জানিয়েছে বলেও জানা গেছে।
তবে প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা এই আপত্তির সঙ্গে একমত নন। মেটাকোর সাবকমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আমিনুল হাকিম বলেন, প্রকল্পে চীনের কোনো সক্রিয় যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হচ্ছে না। দুই প্রান্তে নকিয়ার প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকারি পর্যায়ে নতুন ব্যান্ডউইথ সক্ষমতা তৈরির সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা সি-মি-উই-৬কে ঘিরে। ২০১৯ সালে প্রকল্পটির উদ্যোগ নেওয়া হলেও নানা জটিলতায় বাস্তবায়ন দীর্ঘায়িত হয়েছে।
২০২১ সালে নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি সই করার পরও নির্ধারিত সময়ে কেবলটি চালু করা যায়নি। এখন ২০২৬ সালের শেষ দিকে সেবা চালুর লক্ষ্য রয়েছে।সি-মি-উই-৬ চালু হলে বাংলাদেশ প্রায় ৩০ টেরাবিট প্রতি সেকেন্ড অতিরিক্ত ব্যান্ডউইথ সক্ষমতা পাওয়ার সুযোগ পাবে।
নতুন সাবমেরিন কেবল সময়মতো যুক্ত না হলে বাড়তি ব্যান্ডউইথের চাহিদা মেটাতে আন্তর্জাতিক স্থলপথ, বিশেষ করে ভারতের ওপর নির্ভরতা আরও বাড়তে পারে।
বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবলস পিএলসির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিডিনেট কমিউনিকেশন্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মশিউর রহমান বলেন, ২০০৫ সালে চালু হওয়া কেবলটির ২০ বছরের মেয়াদ শেষ হয়েছে। অন্যদিকে সি-মি-উই-৫-এর সক্ষমতাও শেষের দিকে। সি-মি-উই-৬ নিয়েও জটিলতা রয়েছে।
তার মতে, চাহিদা বাড়তে থাকলে ভারত থেকেই অতিরিক্ত ব্যান্ডউইথ নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। তবে কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির বলেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে এখন শুধু সস্তা শ্রম বা বড় বাজার যথেষ্ট নয়। নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল অবকাঠামোও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে ডেটা সেন্টার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসায় বড় বিনিয়োগের জন্য উচ্চগতির আন্তর্জাতিক সংযোগ প্রয়োজন। এই সক্ষমতায় ঘাটতি থাকলে নতুন বিনিয়োগ অন্য দেশে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
ব্যান্ডউইথের সংকটের প্রভাব শুধু ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের ভোগান্তিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। দেশের ডিজিটাল অর্থনীতি যত বড় হবে, এর প্রভাব ব্যবসা-বাণিজ্য, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগেও পড়বে।
পর্যাপ্ত ও নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক সংযোগ না থাকলে সফটওয়্যার, ফ্রিল্যান্সিং, আউটসোর্সিং, ই-কমার্স, ক্লাউড সেবা ও ডেটা সেন্টারের মতো খাতের সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
টেলিযোগাযোগ খাতের উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ বলেন, দেশে ব্যান্ডউইথের ব্যবহার বছরে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ হারে বাড়ছে। একটি বা দুটি সাবমেরিন কেবল দিয়ে ভবিষ্যতের চাহিদা সামাল দেওয়া সম্ভব নয়।
তার মতে, বাংলাদেশের জন্য একাধিক সাবমেরিন কেবল প্রয়োজন। সরকার সি-মি-উই-৬সহ নতুন কেবল নিয়ে কাজ করছে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতকেও এ খাতে বিনিয়োগে এগিয়ে আসতে হবে।

