বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভে বর্তমানে প্রায় ১৪ হাজার ২৭৮ কেজি বা ১৪ দশমিক ২৮ টন সোনা রয়েছে। এর আর্থিক মূল্য প্রায় ১৩ হাজার ৪৩৬ কোটি টাকা। মজুত এই সোনার বড় অংশই রয়েছে যুক্তরাজ্যের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংক অব ইংল্যান্ডে। এছাড়া কিছু সোনা রাখা হয়েছে লন্ডনের দুটি আন্তর্জাতিক ব্যাংকে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব ভল্টে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সোনার মজুতে কোনো পরিবর্তন হয়নি। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম বেড়ে যাওয়ায় একই পরিমাণ সোনার আর্থিক মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ৪ লাখ ৫৯ হাজার ১৬৩ দশমিক ৫২ ট্রয় আউন্স সোনা ছিল। ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষেও মজুতের পরিমাণ একই রয়েছে। তবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এসব সোনার মূল্য ছিল ১১ হাজার ১৪ কোটি ১০ লাখ টাকা। গত অর্থবছর শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৪৩৬ কোটি ৬২ লাখ টাকা। অর্থাৎ সোনার পরিমাণ অপরিবর্তিত থাকলেও বাজারদর বাড়ায় মূল্য বেড়েছে প্রায় ২ হাজার ৪২২ কোটি ৫২ লাখ টাকা।
১৪ হাজার কেজি সোনা আসলে কত?
মূল্যবান ধাতু যেমন সোনা, রুপা ও প্লাটিনামের ওজন সাধারণত ট্রয় আউন্সে হিসাব করা হয়। এক ট্রয় আউন্স সমান ৩১ দশমিক ১০৩৫ গ্রাম। এটি সাধারণ আউন্সের চেয়ে কিছুটা বেশি। সাধারণ আউন্সের ওজন ২৮ দশমিক ৩৫ গ্রাম, যা দৈনন্দিন পণ্য ও খাদ্যসামগ্রীর ওজন মাপতে ব্যবহৃত হয়।
বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ায় সোনা মাপার প্রচলিত একক ভরি বা তোলা। এক ভরি সমান ১১ দশমিক ৬৬ গ্রাম। সেই হিসাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের মজুত সোনার পরিমাণ প্রায় ১৪ হাজার ২৮২ কেজি বা ১৪ দশমিক ২৮ টন। অর্থাৎ প্রায় ১২ লাখ ২৪ হাজার ৫৮৮ ভরি সোনা রয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভে।
বাড়ছে সোনার দাম, বাড়ছে রিজার্ভের মূল্য
ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতিকে ঘিরে অনিশ্চয়তার কারণে গত দুই বছরে বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ সোনার দিকে ঝুঁকেছেন। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবান এই ধাতুর দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
গোল্ড প্রাইজ ডট অর্গের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুনে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্স সোনার দাম ছিল ৩ হাজার ২৯৭ ডলার। চলতি বছরের ২৯ জানুয়ারি তা বেড়ে ৫ হাজার ৬০০ ডলারে পৌঁছায়। পরে কিছুটা কমে গত ৩০ জুন প্রতি আউন্সের দাম দাঁড়ায় ৪ হাজার ২৪ ডলার। সর্বশেষ গত রোববার তা বিক্রি হয়েছে ৪ হাজার ৪৩০ ডলারে।
দেশের বাজারেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির (বাজুস) তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে দেশে সোনার দাম ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে প্রথমবারের মতো ২২ ক্যারেট সোনার এক ভরির দাম এক লাখ টাকা ছাড়ায়।
২০২৫ সালের জুনে ২২ ক্যারেট সোনার প্রতি ভরির দাম ছিল ১ লাখ ৭০ হাজার ২৩৬ টাকা। চলতি বছরের জুনে তা বেড়ে ২ লাখ ২১ হাজার ৯৬৬ টাকা হয়। সর্বশেষ গত রোববার ভালো মানের প্রতি ভরি সোনার দাম দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৩৫ হাজার ১৪৬ টাকা।
দেশের সোনা কোথায় রাখা আছে?
বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মজুত সোনা এক জায়গায় রাখা নেই। এর সবচেয়ে বড় অংশ রয়েছে যুক্তরাজ্যের ব্যাংক অব ইংল্যান্ডে।
প্রায় ১ লাখ ৮৮ হাজার ৯২৭ ট্রয় আউন্স সোনা ব্যাংক অব ইংল্যান্ডে রাখা হয়েছে, যা লেন্ডিং বা ঋণ কার্যক্রমে ব্যবহার করা হচ্ছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ ব্যাংক এসব সোনা শুধু ভল্টে সংরক্ষণ করে রাখেনি; বরং আন্তর্জাতিক বাজারে নির্দিষ্ট মেয়াদে অন্য ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে ঋণ হিসেবে দিয়ে এর বিপরীতে সুদ বা ফি থেকে আয় করতে পারে।
এ ছাড়া প্রায় ৮৩ হাজার ৯৬১ ট্রয় আউন্স সোনা বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব ভল্টে সরাসরি সংরক্ষিত রয়েছে।
বাকি সোনা যুক্তরাজ্যভিত্তিক দুটি বড় আন্তর্জাতিক ব্যাংক—স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক ও এইচএসবিসিতে আমানত বা বিনিয়োগ হিসেবে রাখা হয়েছে। গত জুন পর্যন্ত স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে ৯২ হাজার ৭৩৯ ট্রয় আউন্স এবং এইচএসবিসিতে ৯৩ হাজার ৫৩৫ ট্রয় আউন্স সোনা জমা ছিল।
সোনার পাশাপাশি আছে রুপাও
বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব ভল্টে সোনার পাশাপাশি ১ লাখ ৬৮ হাজার ৭২৮ ট্রয় আউন্স রুপাও মজুত রয়েছে। গত এক বছরে রুপার পরিমাণেও কোনো পরিবর্তন হয়নি।
তবে রুপার দাম বাড়ায় এর বাজারমূল্যও বেড়েছে। এক বছরের ব্যবধানে মজুত রুপার মূল্য ৭৫ কোটি টাকা থেকে বেড়ে প্রায় ১২১ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সময়ে সোনা নিরাপদ বিনিয়োগ ও ভালো জামানত হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম বাড়তে থাকায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সোনা মজুত রাখা ইতিবাচক এবং লাভজনক বিনিয়োগ।

