বাংলাদেশে আগামী ২০২৬-২৭ বিপণন বছরে চাল উৎপাদন কমার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের তুলনায় আগামী বছরে দেশে চাল উৎপাদন প্রায় সাড়ে ৭ লাখ টন কমতে পারে। একই সঙ্গে কমছে ধান চাষের জমির পরিমাণও। ফলে দেশের খাদ্য সরবরাহ ঠিক রাখতে চাল আমদানির ওপর নির্ভরতা আরও বাড়তে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ বিপণন বছরে বাংলাদেশে চাল উৎপাদন হয়েছিল ৩ কোটি ৭৬ লাখ ৫০ হাজার টন। তবে ২০২৬-২৭ বিপণন বছরে উৎপাদন কমে দাঁড়াতে পারে ৩ কোটি ৬৯ লাখ টনে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে উৎপাদন কমার সম্ভাবনা রয়েছে প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার টন।
শুধু উৎপাদন নয়, কমছে ধান চাষের আওতাধীন জমিও। গত বছর দেশে প্রায় ১ কোটি ১৭ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে ধানের আবাদ হয়েছিল। চলতি বছরে এই পরিমাণ কমে ১ কোটি ১৬ লাখ ৫০ হাজার হেক্টরে নেমে আসতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশে মূলত আউশ, আমন ও বোরো—এই তিন মৌসুমে ধানের চাষ হয়। ইউএসডিএর পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছরে তিন মৌসুমেই উৎপাদন কমতে পারে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে আমন মৌসুমে। গত বছরের তুলনায় এবার আমনের উৎপাদন প্রায় ৩ লাখ টন কমে ১ কোটি ৪৫ লাখ টনে নেমে আসতে পারে।আউশ মৌসুমেও উৎপাদন কমার পূর্বাভাস রয়েছে। এই মৌসুমে উৎপাদন প্রায় আড়াই লাখ টন কমে ২১ লাখ টনে দাঁড়াতে পারে।
দেশের সবচেয়ে বড় ধানের মৌসুম বোরোতেও চাপ তৈরি হয়েছে। গত বছর যেখানে বোরো উৎপাদন ছিল ২ কোটি ৫ লাখ টন, এবার তা কমে ২ কোটি ৩ লাখ টনে নামতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি ব্যবসা ও বিপণন বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম মনে করেন, সাম্প্রতিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ ধান উৎপাদনের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। তার মতে, ভয়াবহ বন্যায় আউশ ও আমন ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। পাশাপাশি অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে আমনের বীজতলাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই উৎপাদন কমার পূর্বাভাস বাস্তবসম্মত বলেই মনে করছেন তিনি।
দেশীয় উৎপাদন কমে গেলে স্বাভাবিকভাবেই চালের আমদানির প্রয়োজন বাড়বে। ইউএসডিএর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ বিপণন বছরে বাংলাদেশকে প্রায় ১৬ লাখ টন চাল আমদানি করতে হতে পারে।
গত বছর যেখানে চাল আমদানির পরিমাণ ছিল ১৪ লাখ টন, এবার তা বেড়ে প্রায় ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারি ও বেসরকারি উভয় পর্যায় থেকেই চাল আমদানির উদ্যোগ নিতে হবে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম বর্তমানে তুলনামূলক বেশি থাকায় আমদানির খরচও বাড়তে পারে।
অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আগে ভারত থেকে কম খরচে চাল আমদানি করা তুলনামূলক সহজ ছিল। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে সেই সুযোগ আগের মতো নাও থাকতে পারে। বিকল্প দেশ থেকে চাল আমদানি করলে খরচ বেড়ে যেতে পারে, যার প্রভাব সাধারণ মানুষের ওপর পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
চালের বাজার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে ইউএসডিএ জানিয়েছে, মে মাসের পর থেকে মোটা চালের দাম কিছুটা কমেছে। তবে উন্নত মানের বা সরু চালের দাম এখনো অনেক বেশি।
জুলাই মাসে সরু চালের গড় বাজারমূল্য ছিল প্রতি কেজি ৭৮ টাকা ১০ পয়সা। ফলে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর খাদ্য ব্যয়ের চাপ এখনো রয়েছে।সরকারি গুদামেও বর্তমানে চালের মজুত রয়েছে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ২০ লাখ ৩৬ হাজার টন চাল এবং ৩৪ হাজার ৭০ টন ধান মজুত রয়েছে।
তবে ইউএসডিএর হিসাব অনুযায়ী, বছর শেষে এই মজুত কমে প্রায় ১৫ লাখ ৫৭ হাজার টনে নেমে আসতে পারে।
আগামী দিনের চাল উৎপাদনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বোরো মৌসুম। কিন্তু এই মৌসুমে পর্যাপ্ত সেচ, বিদ্যুৎ ও সার সরবরাহ নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম সতর্ক করে বলেন, দেশে চলমান গ্যাস সংকটের কারণে প্রায় পাঁচটি সার কারখানা বন্ধ রয়েছে। একই সঙ্গে বিদেশ থেকে সার আমদানির খরচও অনেক বেশি। এসব সমস্যার প্রভাব সরাসরি বোরো উৎপাদনের ওপর পড়তে পারে।
তিনি বলেন, শুধু আমদানি করে দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। দেশের কৃষি উৎপাদন বাড়ানো এবং কৃষকদের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করাই হতে হবে মূল লক্ষ্য।
বাংলাদেশের খাদ্য ব্যবস্থার বড় শক্তি হলো দেশের নিজস্ব ধান উৎপাদন। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগ, কৃষি উপকরণের সংকট, জ্বালানি সমস্যা এবং উৎপাদন ব্যয়ের বৃদ্ধি এখন এই খাতের ওপর চাপ তৈরি করছে।
উৎপাদন কমে গেলে একদিকে যেমন আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়বে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য ওঠানামার ঝুঁকিও বাড়বে। তাই খাদ্য মজুত ধরে রাখা, কৃষকদের সহায়তা দেওয়া এবং উৎপাদন ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার দিকে দ্রুত নজর দেওয়া জরুরি।
কারণ চাল শুধু একটি পণ্য নয়, এটি দেশের মানুষের প্রধান খাদ্য। আর এই খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন বাংলাদেশের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।

