নদীমাতৃক বাংলাদেশে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে গত কয়েক দশকে একের পর এক বড় সেতু নির্মিত হয়েছে। পদ্মা, যমুনা, মেঘনা, গোমতী থেকে শুরু করে রূপসা ও কর্ণফুলী—দেশের অর্থনীতি ও যোগাযোগে এসব সেতুর গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু এত বড় অবকাঠামো নির্মাণের পরও বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত সেতুর নকশা প্রণয়নের জন্য নিজস্ব পূর্ণাঙ্গ জাতীয় মানদণ্ড তৈরি করতে পারেনি।
ফলে একেকটি সেতুর নকশায় একেক দেশের নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছে। কোথাও যুক্তরাজ্যের, কোথাও জাপানের, কোথাও যুক্তরাষ্ট্রের আবার কোথাও ভারতের নকশা মানদণ্ড ব্যবহার করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও আবহাওয়াগত বাস্তবতার সঙ্গে বিদেশি মানদণ্ডের সব বিষয় পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ না হওয়ায় নির্মাণ ও পরবর্তী রক্ষণাবেক্ষণে নানা জটিলতা দেখা দেওয়ার ঝুঁকি থাকে।
দেশে নব্বইয়ের দশকের আগে বড় আকারের সেতুর সংখ্যা ছিল খুবই কম। পরবর্তী সময়ে মেঘনা, মেঘনা-গোমতী এবং যমুনা সেতু চালুর মধ্য দিয়ে বড় সেতু নির্মাণের যুগ শুরু হয়। এরপর দেশের সড়ক যোগাযোগ দ্রুত সম্প্রসারিত হওয়ায় বিভিন্ন অঞ্চলে মাঝারি ও বড় আকারের বহু সেতু নির্মিত হয়েছে। সর্বশেষ দেশের সবচেয়ে বড় পদ্মা সেতুর পাশাপাশি দ্বিতীয় মেঘনা, দ্বিতীয় গোমতী ও দ্বিতীয় কাঁচপুর সেতু চালু হয়েছে। এখন আবার দ্বিতীয় পদ্মা সেতু, দ্বিতীয় যমুনা সেতু এবং বরিশাল-ভোলা সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলছে।
দ্বিতীয় পদ্মা ও দ্বিতীয় যমুনা সেতুর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এমন সময় দেশের নিজস্ব সেতু নকশা মানদণ্ডের অনুপস্থিতি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, পদ্মা সেতুর নকশায় মূলত যুক্তরাজ্যের প্রচলিত মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়েছে। যমুনা সেতুতেও একই দেশের মানদণ্ড ব্যবহার করা হয়। অন্যদিকে দ্বিতীয় কাঁচপুর, দ্বিতীয় মেঘনা ও দ্বিতীয় গোমতী সেতুর নকশায় জাপানের নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছে। প্রথম মেঘনা ও প্রথম গোমতী সেতুতেও জাপানি নকশা পদ্ধতির প্রভাব ছিল।
রূপসা নদীর ওপর নির্মিত বড় রেলসেতুর নকশায় ভারতের মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়েছে। যমুনার ওপর নির্মিত দেশের বৃহৎ রেলসেতুতে জাপানের নিয়ম ব্যবহার করা হয়েছে। কর্ণফুলী নদীর ওপর তৃতীয় কর্ণফুলী সেতু নির্মাণে আবার যুক্তরাষ্ট্রের নকশা মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণত যে দেশের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কোনো সেতুর নকশা তৈরির দায়িত্ব পায়, তারা নিজেদের পরিচিত মানদণ্ড ব্যবহারের দিকে ঝোঁকে। ফলে একই দেশে নির্মিত বিভিন্ন সেতুর নকশা, নির্মাণ এবং রক্ষণাবেক্ষণ নীতির মধ্যে ভিন্নতা তৈরি হচ্ছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ও জাপানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের এক যৌথ গবেষণাতেও এ বিষয়টি উঠে এসেছে। গত এক শতাব্দীতে বাংলাদেশে নির্মিত বিভিন্ন সেতুর নকশা, নির্মাণ এবং রক্ষণাবেক্ষণ পর্যালোচনা করে গবেষকেরা দেখেছেন, দেশে এখনো সেতু নির্মাণের জন্য স্বতন্ত্র জাতীয় নকশা বিধিমালা নেই।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর নিজেদের নির্দেশিকা ব্যবহার করলেও সেগুলোতে বিদেশি বিভিন্ন মানদণ্ড অনুসরণের সুযোগ রাখা হয়েছে। ফলে প্রকল্পভেদে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান বা ভারতের বিধি ব্যবহার করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশি মানদণ্ড ব্যবহার নিজে থেকেই ভুল নয়। সমস্যা তৈরি হয় যখন বাংলাদেশের মাটি, নদীর আচরণ, তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, বাতাসের গতি, ভূমিকম্পের ঝুঁকি এবং অন্যান্য স্থানীয় পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য যথাযথভাবে সমন্বয় করা হয় না।
পদ্মা সেতু নির্মাণের সময় কয়েকটি খুঁটির নকশা ও ভিত্তি নির্মাণে জটিলতা দেখা দিয়েছিল। নদীর তলদেশে প্রত্যাশার চেয়ে ভিন্ন ধরনের মাটির স্তর পাওয়ায় কিছু খুঁটির ভিত্তি আরও গভীরে নিতে হয় এবং বিশেষ পদ্ধতিতে মাটি শক্ত করার ব্যবস্থা করতে হয়। কয়েকটি খুঁটিতে অতিরিক্ত পাইলও ব্যবহার করতে হয়েছে।
রূপসা রেলসেতু নির্মাণের সময়ও নদীর তলদেশের দুর্বল মাটির কারণে পাইল বসাতে সমস্যার সৃষ্টি হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে মাটির ধারণক্ষমতা বাড়াতে বিশেষ রাসায়নিক প্রক্রিয়ার সাহায্যে ভিত্তির নিচের অংশ শক্তিশালী করা হয়।
প্রথম মেঘনা সেতুর ক্ষেত্রেও ভূমিকম্প সহনক্ষমতা নিয়ে গবেষণায় প্রশ্ন উঠেছে। সেতুটি দেশের বর্তমান ভবন নির্মাণ বিধিমালা প্রণয়নের আগেই নির্মিত হওয়ায় এর নকশায় ব্যবহৃত ভূমিকম্প সহনমাত্রা বর্তমান মানের তুলনায় কম ছিল বলে গবেষকেরা উল্লেখ করেছেন।
যমুনা সেতুর ক্ষেত্রে তাপমাত্রার প্রভাব নিয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ পাওয়া গেছে। সেতুটির নকশায় যুক্তরাজ্যের আবহাওয়ার ভিত্তিতে তৈরি একটি মানদণ্ড ব্যবহার করা হয়েছিল। সেখানে সেতুর উপরিকাঠামোর তাপমাত্রা ওঠানামার যে সীমা ধরা হয়েছিল, বাংলাদেশের বাস্তব পরিবেশে তার চেয়ে অনেক বেশি পরিবর্তন দেখা যায়।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা যায়, গ্রীষ্ম ও শীত উভয় মৌসুমেই সেতুর কাঠামোর তাপমাত্রায় উল্লেখযোগ্য ওঠানামা ঘটে। আবার শিলাবৃষ্টির মতো আকস্মিক আবহাওয়ায় খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তাপমাত্রা অনেক কমে যেতে পারে। গবেষকদের মতে, এ ধরনের পরিবর্তন নকশায় যথেষ্টভাবে বিবেচিত না হলে সেতুর বিভিন্ন অংশে সংকোচন ও প্রসারণের চাপ তৈরি হতে পারে।
যমুনা সেতুতে নির্মাণ শেষ হওয়ার আগেই কিছু ফাটল দেখা দেওয়ার পেছনে তাপমাত্রাজনিত চাপের ভূমিকা ছিল বলে একাধিক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে সেগুলো মেরামত এবং সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো বিদেশি দেশের নকশা মানদণ্ড হুবহু বাংলাদেশে প্রয়োগ করা যুক্তিসঙ্গত নয়। কারণ বাংলাদেশের আবহাওয়া, তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, নদীর স্রোত, পলিমাটি এবং ভূমিকম্পের বৈশিষ্ট্য অন্য দেশের তুলনায় ভিন্ন।
বিশেষ করে বড় নদীর ওপর সেতু নির্মাণে নদীর তলদেশের পরিবর্তন, মাটির প্রকৃতি, পানিপ্রবাহ এবং স্থানীয় আবহাওয়ার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়েই একটি নিজস্ব জাতীয় সেতু নকশা মানদণ্ড তৈরি করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন প্রকৌশলীরা।
বাংলাদেশে এখন দ্বিতীয় পদ্মা সেতু, দ্বিতীয় যমুনা সেতু এবং বরিশাল-ভোলা সেতুর মতো আরও কয়েকটি বড় প্রকল্পের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এসব প্রকল্পে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ হবে এবং কয়েক দশক ধরে এগুলো দেশের যোগাযোগব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তাই নতুন বড় সেতু নির্মাণের আগে বাংলাদেশের ভৌগোলিক, জলবায়ুগত ও ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি জাতীয় নকশা মানদণ্ড তৈরি করা জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, নিজস্ব মানদণ্ড থাকলে শুধু নকশা ও নির্মাণের সামঞ্জস্যই বাড়বে না, ভবিষ্যতে সেতুর রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনাও আরও সহজ ও কার্যকর হবে।

