দেশের চলমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বড় উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড (বিজিএফসিএল)। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের নতুন তিনটি কূপ থেকে আগামী ছয় মাসের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন অন্তত ৪৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
দেশের মোট প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদনের প্রায় ২৭ শতাংশ সরবরাহ করে বিজিএফসিএল। উৎপাদন বাড়াতে প্রতিষ্ঠানটি তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে ২৯, ৩০ ও ৩১ নম্বর নতুন কূপ খননের উদ্যোগ নিয়েছে।
এর মধ্যে ৩১ নম্বর কূপের খনন কাজ বর্তমানে চলমান রয়েছে। ২৯ নম্বর কূপের খনন ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে এবং একই রিগ ব্যবহার করে ৩০ নম্বর কূপ খননের কাজ করা হবে।
তিতাসের নন্দনপুর এলাকায় অবস্থিত ৩১ নম্বর কূপটি দেশের প্রথম গভীর অনুসন্ধানমূলক গ্যাস কূপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। গত ১৯ এপ্রিল থেকে এর খনন কার্যক্রম শুরু হয়।
কূপটি প্রায় ৫ হাজার ৬০০ মিটার গভীর পর্যন্ত খননের পরিকল্পনা রয়েছে। ইতোমধ্যে এটি ৪ হাজার ৯২০ মিটার গভীরতায় পৌঁছেছে। এটি দেশের সবচেয়ে বেশি চাপ ও উচ্চ তাপমাত্রার গ্যাস অনুসন্ধান কূপ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
বিজিএফসিএল আশা করছে, চলতি বছরের মধ্যেই কূপটির খনন শেষ হবে এবং এখান থেকে প্রতিদিন প্রায় ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
কূপটির আশপাশের এলাকায় প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সম্ভাবনা রয়েছে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তবে ভূগর্ভের গভীর স্তরে প্রকৃত মজুত সম্পর্কে নিশ্চিত হতে অনুসন্ধান কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়া প্রয়োজন।
গভীর অনুসন্ধান গ্যাস কূপ খনন প্রকল্পের পরিচালক মো. মাহমুদুল নবাব জানান, ৩১ নম্বর কূপের খনন কাজ শেষ হতে আরও প্রায় তিন মাস সময় লাগতে পারে।
তিনি বলেন, তিতাসে এখন পর্যন্ত প্রায় ৩ হাজার ৭০০ মিটার পর্যন্ত খনন করা হয়েছে। ভূগর্ভের আরও নিচে কী রয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। দেশের বর্তমান জ্বালানি সংকটের কথা বিবেচনা করেই গভীর স্তরের গ্যাস অনুসন্ধানের এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিজিএফসিএলের তথ্য অনুযায়ী, তিতাস গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয় ১৯৬২ সালে। তৎকালীন পাকিস্তান শেল অয়েল কোম্পানি এটি আবিষ্কার করে এবং ১৯৬৮ সালে বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস উৎপাদন শুরু হয়।
বর্তমানে তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের ২৩টি উৎপাদনশীল কূপ থেকে প্রতিদিন গড়ে ৩৩১ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পুরোনো কূপগুলোর চাপ ও মজুত কমে যাওয়ায় উৎপাদন ধীরে ধীরে কমছে। এই পরিস্থিতিতে নতুন কূপ খননের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে বিজিএফসিএল।
বিজিএফসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. আবদুল জলিল প্রামাণিক জানান, তিনটি কূপের খনন কাজ ছয় মাসের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। এরপর এসব কূপ থেকে প্রতিদিন অন্তত ৪৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ হতে পারে।
তিনি বলেন, দেশের মোট চাহিদার তুলনায় এই অতিরিক্ত গ্যাসের পরিমাণ খুব বেশি নয়। তবে এর গুরুত্ব অনেক, কারণ এটি দেশের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমাতে সহায়তা করবে।
বর্তমানে বাংলাদেশ গ্যাসের চাহিদা পূরণে দেশীয় উৎপাদনের পাশাপাশি আমদানিকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপরও নির্ভর করছে। ফলে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে পারলে জ্বালানি ব্যয় ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় কিছুটা স্বস্তি আসতে পারে।
তিতাস ছাড়াও বিজিএফসিএল পরিচালিত অন্যান্য গ্যাসক্ষেত্রে নতুন কূপ খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে এসব কূপ খননের মাধ্যমে দেশের গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করা হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন কূপ থেকে পাওয়া গ্যাস দেশের জ্বালানি সংকট পুরোপুরি দূর করবে না, তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে গ্যাস অনুসন্ধান, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বিকল্প জ্বালানি ব্যবস্থার সমন্বিত পরিকল্পনাই দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

