আসন্ন বোরো মৌসুমে সেচ কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখতে জরুরি ভিত্তিতে সাড়ে নয় হাজার সাতশ পঞ্চাশ কোটি টাকার বকেয়া ভর্তুকি ছাড়ের অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড। দেশের খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত এই মৌসুমে বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের পুরনো বিল মিটিয়ে দেওয়াকেই এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় বলে মনে করছে সংস্থাটি।
দেশের মোট সেচ পাম্পের প্রায় ঊনত্রিশ শতাংশই চলে বিদ্যুতের মাধ্যমে। আর বছরের যে মৌসুমে সেচের চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে, সেটিই বোরো—কারণ দেশের মোট চাল উৎপাদনের অর্ধেকের বেশি আসে এই একটি মৌসুম থেকেই। এই বাস্তবতা মাথায় রেখে বিদ্যুৎ সরবরাহের পাশাপাশি সার সরবরাহ ব্যবস্থাও নতুন করে সাজাতে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার, বিশেষ করে ডিলার নেটওয়ার্ক পুনর্গঠনের মাধ্যমে।
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গ্রীষ্ম ও বোরো মৌসুমে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখার লক্ষ্যে উৎপাদনকারীদের পাওনা আগেভাগেই মিটিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে গত পনেরো সেপ্টেম্বর অর্থ মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে।
বকেয়ার হিসাব বলছে ভিন্ন গল্প। গত আগস্ট পর্যন্ত হিসাবে বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে ভর্তুকি বাবদ পাওনা প্রায় চার হাজার ছয়শ তেষট্টি কোটি টাকা। রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্টের বকেয়া সামান্য—মাত্র সোয়া এক কোটি টাকা। ভারত ও নেপাল থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের বকেয়া প্রায় সাড়ে চারশ ষাট কোটি টাকা, যার একটি বড় অংশ আদানি পাওয়ারের ঝাড়খন্ড কেন্দ্র থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের।
তবে সবচেয়ে বড় অঙ্কের বকেয়া রয়েছে দুটি নির্দিষ্ট কোম্পানির ক্ষেত্রে। একটি প্রতিষ্ঠানের ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত সময়ের বকেয়া প্রায় তিন হাজার একশ তেইশ কোটি টাকা, আর কয়লাভিত্তিক একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত বকেয়া দাঁড়িয়েছে প্রায় এক হাজার পাঁচশ নয় কোটি টাকায়।
সংস্থাটির যুক্তি হলো, এই ভর্তুকির অর্থ সময়মতো ছাড় হলে সব ধরনের বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী ও আমদানিকারকের বিল যথাসময়ে মেটানো সম্ভব হবে, যার ফলে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা মসৃণভাবে চলতে পারবে। পাশাপাশি প্রতিটি কেন্দ্রে পর্যাপ্ত জ্বালানি ও কয়লার মজুত রাখাও জাতীয় স্বার্থে জরুরি বলে মনে করছে সংস্থাটি।
সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে মোট চার কোটি ছয় লাখ টন চাল উৎপাদিত হয়েছে, যার মধ্যে বোরো থেকেই এসেছে দুই কোটি তেরো লাখ টন—অর্থাৎ মোট উৎপাদনের বাহান্ন শতাংশের বেশি। প্রায় এক কোটি বিশ লাখ একর জমিতে বোরো চাষ হয়েছিল সেই বছর, এবং আসন্ন মৌসুমে চাষের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এই বিশাল আয়তনের জমিতে ফলন নিশ্চিত করতে একটানা প্রায় চার মাস সেচ প্রয়োজন হবে।
কৃষি উন্নয়ন সংস্থার সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, দেশে মোট সেচ পাম্পের সংখ্যা সতেরো লাখ বিশ হাজারের মতো, যার মধ্যে প্রায় চার লাখ বিরানব্বই হাজার পাম্প বিদ্যুতে চলে এবং এসব পাম্প মিলিয়ে প্রায় পঁচিশ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ দেওয়া সম্ভব হয়। এছাড়া ডিজেলে চলে প্রায় বারো লাখ ত্রিশ হাজার পাম্প এবং সৌরবিদ্যুতে চলে প্রায় তিন হাজার পাম্প। বিদ্যুৎ বিভাগের হিসাব অবশ্য কিছুটা ভিন্ন—তাদের মতে বিদ্যুৎচালিত পাম্পের সংখ্যা প্রায় চার লাখ আটানব্বই হাজার। মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের সাড়ে দুই শতাংশের মতো ব্যয় হয় কৃষি খাতে।
দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের অংশ হিসেবে সরকার আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে সব সেচ পাম্পকে সৌরবিদ্যুতের আওতায় আনার পরিকল্পনা নিয়েছে। এ লক্ষ্যে চলতি অর্থবছরে সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জাম আমদানিতে শুল্ক সুবিধাও দেওয়া হয়েছে।
আবহাওয়াগত ঝুঁকিও এই মৌসুমকে করে তুলছে আরও জটিল। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার পূর্বাভাস বলছে, ২০২৬-২৭ সালে এল নিনো পরিস্থিতি অত্যন্ত শক্তিশালী রূপ নিতে পারে, যার প্রভাবে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টিপাত ও শুষ্ক আবহাওয়া বিরাজ করতে পারে। সরকারি কর্মকর্তারা মনে করছেন, এর ফলে বোরো মৌসুমে তীব্র খরা ও রেকর্ড তাপমাত্রার আশঙ্কা রয়েছে, যা সেচের চাহিদা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
বিদ্যুতের পাশাপাশি সারের সরবরাহ নিশ্চিত করতেও একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। আগের সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া প্রায় তিন হাজার সাতশ ঊনষাট জন সার ডিলার পলাতক থাকায় সংশ্লিষ্ট পয়েন্টগুলো খালি পড়ে আছে—এই তথ্য সম্প্রতি জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী। এই শূন্যতা পূরণে প্রায় চার হাজার নয়শ আঠারো জন নতুন ডিলার নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যা আগামী মাসের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সংসদে জানানো তথ্য অনুযায়ী, আগামী অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশে সারের চাহিদা প্রায় পঁয়ত্রিশ লাখ সাতাশি হাজার টন, যেখানে সরকারের হাতে সরবরাহের ব্যবস্থা রয়েছে প্রায় একান্ন লাখ একাত্তর হাজার টন—অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় উদ্বৃত্ত থাকছে প্রায় পনেরো লাখ চুরাশি হাজার টন। বোরো মৌসুমে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় ইউরিয়া সারের, যে কারণে সব জেলা থেকে চাহিদার তথ্য সংগ্রহের কাজ শুরু করেছে সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর।
গ্যাস সংকটে দেশীয় কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় আমদানির ওপর ভরসা রাখতে হচ্ছে সরকারকে। ইতিমধ্যে ইউরিয়া, এমওপি, টিএসপি ও ডিএপি মিলিয়ে প্রায় বিশ লাখ টন সার আমদানির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সরকারি ক্রয় কমিটির সাম্প্রতিক এক বৈঠকে পঁয়ত্রিশ হাজার টন এমওপি, চল্লিশ হাজার টন ইউরিয়া ও আশি হাজার টন ডিএপি আমদানির অনুমোদনও দেওয়া হয়েছে, পাশাপাশি বেসরকারি খাতের কয়েক ডজন প্রতিষ্ঠানকে বিভিন্ন সারের আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
গত ১৩ সেপ্টেম্বর কৃষি মন্ত্রণালয় পরিদর্শনে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং বোরো মৌসুমে নির্বিঘ্ন উৎপাদন নিশ্চিত করতে সার ও সেচের বিষয়ে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেন। মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শিল্প ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়কেও এ বিষয়ে সরাসরি নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী, তবে সার্বিক সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়কে।
কৃষি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি জানিয়েছেন, সার ক্রয় বা মজুতে কোনো সংকট নেই, তবে বিতরণ ব্যবস্থায় কিছু জটিলতা এখনও থেকে যাচ্ছে। সেচ ব্যাহত না হওয়া নিশ্চিত করতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগকেও পরামর্শ দিয়েছে কমিটি, এবং সেচ পাম্পগুলোকে সৌরশক্তির আওতায় আনার উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন এতটা নিরুদ্বেগ নয়। কৃষি বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করছেন, আবহাওয়াগত পরিবর্তন ও ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতার কারণে আসন্ন মৌসুমটি রীতিমতো চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠতে পারে। দিনের সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ তাপমাত্রার ব্যবধান বেড়ে যাওয়ায় মাটি ফাটার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, যা সেচের চাহিদাকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অংশে সার সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতাও চিহ্নিত হয়েছে, যা সময়মতো আমদানি ও বিতরণ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাকে আরও জরুরি করে তুলেছে।
সব মিলিয়ে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আসন্ন বোরো মৌসুম কেবল একটি কৃষি মৌসুম নয়—বরং জ্বালানি, সার সরবরাহ, আবহাওয়াগত ঝুঁকি এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনার একটি জটিল সমন্বয়ের পরীক্ষা। বিদ্যুৎ খাতের বকেয়া মেটানো থেকে শুরু করে সার আমদানি ও বিতরণ ব্যবস্থার সংস্কার—প্রতিটি পদক্ষেপই একে অপরের সঙ্গে জড়িত, এবং এর যে কোনো একটিতে বিলম্ব হলে দেশের খাদ্য উৎপাদন ও নিরাপত্তার ওপর তার প্রভাব পড়তে পারে ব্যাপকভাবে।

