ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার দুই বছরের বেশি সময় পর সাংগঠনিক পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে আওয়ামী লীগ। এর অংশ হিসেবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও দলটির সভাপতি শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলকে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম প্রেসিডিয়ামে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন দলটির জ্যেষ্ঠ নেতারা।
দলীয় নেতাদের ভাষ্য, শেখ হাসিনার সম্ভাব্য দেশে ফেরা এবং আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনার মধ্যেই সংগঠন পুনর্গঠনের বিষয়টি সামনে এসেছে। এই প্রক্রিয়ায় পুতুলকে প্রেসিডিয়ামের সদস্য করার বিষয়ে আলোচনা এগিয়েছে এবং চলতি সেপ্টেম্বরেই তার মনোনয়ন চূড়ান্ত হতে পারে।
পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে শুক্রবার আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির একটি বৈঠক ডাকা হয়েছে। শুরুতে ভারতের নয়াদিল্লিতে সশরীরে বৈঠকটি আয়োজনের পরিকল্পনা করা হলেও বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তা পরিবর্তন করে ভার্চুয়ালি করার সিদ্ধান্ত হয়।
তবে শুধু পুতুল নন, প্রেসিডিয়ামে আরও দুই নেতাকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়েও আলোচনা চলছে। দলীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম ও বরিশাল বিভাগ থেকে একজন করে নেতাকে প্রেসিডিয়ামে নেওয়া হতে পারে।
আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, কাউন্সিল কিংবা কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে দলের সভাপতি প্রেসিডিয়াম সদস্য মনোনয়ন দিতে পারেন।
দলের কয়েকজন নেতা জানিয়েছেন, শুক্রবারের বৈঠকেই পুতুলের মনোনয়ন চূড়ান্ত হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটি যদি দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনাকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেয়, তাহলে পরিবারের সদস্য ও দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে পরামর্শের পর ২২ সেপ্টেম্বরের দিকে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হতে পারে বলে তারা ধারণা করছেন।
দিল্লিতে জড়ো হন কেন্দ্রীয় নেতারা
আওয়ামী লীগ প্রথমে কেন্দ্রীয় নেতাদের নয়াদিল্লিতে এনে সশরীরে বৈঠকের পরিকল্পনা করেছিল। তবে শেষ মুহূর্তে সেই পরিকল্পনা বদলানো হয়।
দলীয় সূত্রের ভাষ্য, কেন্দ্রীয় কমিটির সব সদস্য বর্তমানে ভারতে না থাকাও সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের একটি কারণ। তবে বৈঠকের খবর জানার পর ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে অবস্থানরত কয়েকজন নেতা ইতোমধ্যে দিল্লিতে পৌঁছান।
আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় দিল্লিতে পৌঁছানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
সেখানে অবস্থানরত অন্য নেতাদের মধ্যে প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক ও এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটনের নামও রয়েছে।
এ ছাড়া যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ ও আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম; সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেন, মির্জা আজম, শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল ও সুজিত রায় নন্দী এবং অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেনও দিল্লিতে রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
অন্যদের মধ্যে রয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক সম্পাদক ওয়াসিকা আয়শা খান, আইনবিষয়ক সম্পাদক নাজিবুল্লাহ হিরু, তথ্য ও গবেষণাবিষয়ক সম্পাদক সেলিম মাহমুদ, দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া, উপদপ্তর সম্পাদক সায়েম খান, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক মৃণাল কান্তি দাস, সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল এবং সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল।
কেন্দ্রীয় কমিটির একজন সদস্য জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের স্পর্শকাতরতার কারণে দিল্লিতে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ না করতে নেতাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তার ভাষ্য, এর পেছনে ‘কৌশলগত বিবেচনাও’ থাকতে পারে।
আবার সামনে উত্তরাধিকারের প্রশ্ন
পুতুলকে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আনার সম্ভাবনা নতুন করে দলটির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে আলোচনা তৈরি করেছে।
শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকার সময়ও আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব কে দেবেন—এ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সরকারের পতনের পর শেখ হাসিনা বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে চলে যান। তিনি বর্তমানে সেখানেই অবস্থান করছেন।
পুতুল এর আগে নয়াদিল্লিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ওয়েবসাইটে বর্তমানে তাকে আঞ্চলিক পরিচালক হিসেবে উল্লেখ করা হলেও তিনি ছুটিতে আছেন এবং ১৭ আগস্ট থেকে একজন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করছেন। অন্যদিকে তার পদত্যাগের খবরও আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
এদিকে শেখ হাসিনা রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, তিনি এবং আওয়ামী লীগের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা আগামী ডিসেম্বরের দিকে বাংলাদেশে ফিরে আদালতের মুখোমুখি হওয়ার পরিকল্পনা করছেন।
এই সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ সাংগঠনিক নেতৃত্ব নিয়েও আলোচনা চলছে। শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হলে দলের দৈনন্দিন নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক কার্যক্রম কীভাবে পরিচালিত হবে, সেটিও দলটির সামনে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
এই প্রেক্ষাপটেই দলীয় পুনর্গঠন এবং পুতুলকে সক্রিয় রাজনীতিতে আনার বিষয়টি নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। তবে তাকে প্রেসিডিয়ামে নেওয়ার সিদ্ধান্ত এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি; বিষয়টি আপাতত দলীয় আলোচনা ও মনোনয়ন প্রক্রিয়ার পর্যায়ে রয়েছে।

