রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বের পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারকারী দেশগুলোর কাতারে প্রবেশ করেছে। দেশের প্রথম পারমাণবিক স্থাপনা হিসেবে রূপপুরের এই অগ্রগতি বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে তুলে ধরেছে প্রকল্পটির রুশ সহযোগী প্রতিষ্ঠান রোসাটম।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) রাশিয়ার ইয়েকাতেরিনবার্গে অনুষ্ঠিত ‘ইন্টারন্যাশনাল ফেস্টিভ্যাল অব ইয়ুথ’ (আইএফওয়াই-২০২৬)-এর ‘মিডিয়া স্ট্রিম’ কর্মসূচির আওতায় ‘আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে রাশিয়ার ভাবমূর্তি’ শীর্ষক এক প্লেনারি অধিবেশনে বিষয়টি তুলে ধরেন রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু শক্তি করপোরেশন রোসাটমের যোগাযোগ বিভাগের পরিচালক আন্দ্রে তিমোনভ।
আন্দ্রে তিমোনভ বলেন, পারমাণবিক প্রযুক্তির ক্ষেত্রে রোসাটম বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি এবং উৎপাদন চক্রের প্রতিটি পর্যায়ে তারা আন্তর্জাতিক মানের প্রযুক্তিগত সমাধান দিয়ে থাকে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিস্তৃত কার্যক্রমের কারণে প্রতিষ্ঠানটির এই অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
রূপপুর প্রকল্পের প্রসঙ্গে তিমোনভ বলেন, চলতি বছর রোসাটম তাদের বাংলাদেশি অংশীদারদের সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের নির্মাণকাজ সম্পন্ন করেছে। চলতি গ্রীষ্মেই ইউনিটটির কমিশনিং কার্যক্রম শুরু হয়েছে বলেও জানান তিনি।
তাঁর ভাষ্য, বাংলাদেশে একটি নতুন পারমাণবিক শক্তির অধ্যায়ের সূচনা হচ্ছে। এই প্রকল্প শুধু দেশের জ্বালানি চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখবে না, ভবিষ্যৎ উন্নয়নের ক্ষেত্রেও নতুন গতি তৈরি করবে।
তিমোনভের মতে, পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশ এমন একটি প্রযুক্তিগত অগ্রযাত্রা সম্পন্ন করার চেষ্টা করছে, যেটিতে অন্য অনেক দেশের কয়েক দশক সময় লেগেছে।
বাংলাদেশে তাঁর একাধিক সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও মানুষের প্রতি তিনি মুগ্ধ। একই সঙ্গে বাংলাদেশের ইতিহাসকে ‘অত্যন্ত জটিল’ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
রোসাটমের এই কর্মকর্তা বলেন, মাত্র এক দশক আগেও বাংলাদেশে পারমাণবিক শক্তি নিয়ে আলোচনা করা কঠিন ছিল। অথচ এখন দেশটিকে একটি নতুন পারমাণবিক শক্তি হিসেবে স্বাগত জানানোর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশজুড়ে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ঘিরে সাধারণ মানুষের ব্যাপক আগ্রহের বিষয়টিও তুলে ধরেন তিমোনভ। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ও রাশিয়া—দুই দেশেই বিপুলসংখ্যক তরুণ পারমাণবিক বিদ্যা ও প্রযুক্তিতে শিক্ষিত হওয়ার প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছেন।
তিনি বলেন, পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের স্বপ্ন বাংলাদেশের জন্য নতুন নয়। কয়েক দশক আগে সোভিয়েত ইউনিয়নের সময়ই দেশে প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ধারণা সামনে এসেছিল। সে সময় তৎকালীন সোভিয়েত নেতা লিওনিদ ইলিচ ব্রেজনেভের কাছে এ বিষয়ে অনুরোধও জানানো হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।
তিমোনভ বলেন, বাংলাদেশ এখন শুধু জ্বালানি ঘাটতি পূরণের জন্য একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে না। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মাধ্যমে দেশটি এমন একটি প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জনের পথে এগোচ্ছে, যা অন্য অনেক দেশের ক্ষেত্রে ৬০ থেকে ৮০ বছর সময় নিয়েছে।
রূপপুর প্রকল্পের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিমোনভ বলেন, শুরুতে রোসাটমের লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশে একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা। কিন্তু প্রকল্পটি শেষ পর্যন্ত জাতীয় গর্বের প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
তিনি বলেন, রূপপুরে এমন একটি স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে, যা নিয়ে পুরো বাংলাদেশ গর্বিত।
রোসাটমের দেওয়া এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ‘ফলো ইওর ড্রিম’ স্লোগানকে সামনে রেখে ১১ থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর ইয়েকাতেরিনবার্গে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘ইন্টারন্যাশনাল ফেস্টিভ্যাল অব ইয়ুথ’ (আইএফওয়াই-২০২৬)।
আন্তর্জাতিক এই উৎসবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ১ লাখ ১৩ হাজারের বেশি আবেদন জমা পড়ে। শেষ পর্যন্ত ১৯১টি দেশের ১০ হাজার অংশগ্রহণকারী এতে অংশ নেন।
উৎসবে বাংলাদেশও প্রতিনিধিত্ব করেছে। দেশটির প্রায় ৯০ জন প্রতিনিধি ইয়েকাতেরিনবার্গের এই আন্তর্জাতিক যুব আয়োজনে অংশ নেন।

