রাজস্ব ঘাটতির চাপে পড়ে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের ১১টি মেইল ও লোকাল ট্রেন বেসরকারি অপারেটরদের কাছে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। ইতোমধ্যে চারটি ট্রেনের দরপত্র দাখিল সম্পন্ন হয়েছে এবং বাকিগুলোর দরপত্র পর্যায়ক্রমে আহ্বান করা হবে। রেলওয়ে সূত্র জানিয়েছে, পার্বতীপুর-রংপুর রুটের ‘রমনা কিমিউটার’, বোনারপাড়া জং-পার্বতীপুর রুটের ‘রামসাগর মেইল’, লালমনিহাট-বুড়িমারী রুটের ‘বুড়িমারী কমিউটার’ এবং পার্বতীপুর-লালমনিহাট রুটের ‘লালমনি কমিউটার’ ট্রেনের দরপত্র ইতোমধ্যে দাখিল হয়েছে। পরবর্তীতে রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ রুটের ‘পূর্নভবা’ ও ‘মল্লিকা’ ট্রেনের দরপত্র আহ্বান করা হবে।
পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে দীর্ঘদিন ধরে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারছে না। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে পশ্চিমাঞ্চলের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ হাজার ৩৭৭ কোটি টাকা, কিন্তু আয় হয়েছে মাত্র ৬৪৯ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ হাজার ১৬০ কোটি টাকা, আয় হয়েছে ৬২১ কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮২৫ কোটি টাকা, কিন্তু আয় হয়েছে ৫৬৬ কোটি টাকা । এই ঘাটতির পেছনে মূল কারণ হিসেবে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ যাত্রীদের টিকিট না কেনার প্রবণতাকে চিহ্নিত করেছে। পশ্চিমাঞ্চলের প্রধান বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপক আহসান উল্লাহ ভূঁইয়া বলেছেন, মেইল ও লোকাল ট্রেনে সঠিকভাবে টিকিট পরীক্ষা করার জন্য পর্যাপ্ত জনবল নেই, যার কারণে বিপুল রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে । রেলওয়ের তথ্য বলছে, পশ্চিমাঞ্চলে মোট ২২ হাজার ৩৫৮টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ১১ হাজার ৫২২ জন, অর্থাৎ প্রায় ১১ হাজার পদের শূন্যতা রয়েছে। এই ঘাটতির কারণে মেইল ও লোকাল ট্রেনে টিকিট চেকিং কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে এবং যাত্রীরা টিকিট ছাড়াই ভ্রমণ করছেন ।
পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক ফরিদ আহমেদ জানিয়েছেন, ট্রেন ইজারার প্রস্তাব চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য রেলওয়ে সদর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। কর্তৃপক্ষের যুক্তি হলো, কম দূরত্বে চলা মেইল ও লোকাল ট্রেন সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালনা করতে গেলে বছরে মোটা অঙ্কের লোকসান হয়। বেসরকারি অপারেটররা অভ্যন্তরীণ সেবা, টিকিট পরিদর্শন, পরিচ্ছন্নতা ও যাত্রী ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নিলে সেবার মান বাড়বে এবং রাজস্ব বৃদ্ধি পাবে। রেলওয়ে সূত্র বলছে, বর্তমানে পশ্চিমাঞ্চলে সাত জোড়া (১৪টি) ট্রেন বেসরকারিভাবে পরিচালিত হচ্ছে এবং এর মধ্যে ২৪টি মেইল, কমিউটার ও লোকাল ট্রেন ইজারা দিয়ে প্রতি মাসে প্রায় ১ কোটি ৩৩ লাখ টাকা আয় করা হচ্ছে । বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত ট্রেনগুলো সরকারি ব্যবস্থাপনার তুলনায় ২৫ থেকে ৫০ শতাংশ বেশি রাজস্ব উৎপন্ন করছে বলে রেলওয়ের তথ্য বলছে ।
তবে এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন যাত্রী অধিকারকর্মীরা। সুশাসনের জন্য নাগরিকের রাজশাহী জেলা শাখার সভাপতি আহমেদ শাফি উদ্দিন প্রশ্ন তুলেছেন, যদি বেসরকারি অপারেটররা একই যাত্রী ও ভাড়ার ভিত্তিতে ট্রেন পরিচালনা করে লাভ করতে পারে, তাহলে বাংলাদেশ রেলওয়ে নিজে কেন তা পারছে না? তিনি বলেছেন, ‘যদি উদ্দেশ্য শুধু কয়েকজন ব্যবসায়ীর জন্য ব্যবসায়িক সুযোগ তৈরি করা হয়, তবে এই উদ্যোগ প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। আমাদের দেশে বেসরকারিকরণের ফলে সাধারণ মানুষের ব্যয় বেড়ে যায়’ । যাত্রী কল্যাণ সমিতির সেক্রেটারি জেনারেল মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেছেন, বেসরকারি অপারেটররা যদি লাভজনকভাবে ট্রেন চালাতে পারে, তাহলে সেটি রেলওয়ের ভেতরে দুর্নীতি ও স্বচ্ছতার অভাবকেই ইঙ্গিত করে ।
রেলওয়ের আর্থিক চিত্র সামগ্রিকভাবে সংকটাপন্ন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ রেলওয়ের মোট আয় হয়েছে ২ হাজার ৬৬ কোটি ৩৮ লাখ টাকা, যা আগের বছরের চেয়ে ২২১ কোটি টাকা বেশি। কিন্তু মোট পরিচালন ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ৯৫৫ কোটি টাকা, ফলে লোকসান দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮৮৮ কোটি টাকা । রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ অবশ্য বলছে, প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা পেনশন ব্যয় বাদ দিলে পরিচালন ব্যয় কমে দাঁড়ায় ২ হাজার ৯৫৫ কোটি টাকা এবং অপারেটিং রেশিও হয় ১.৪৩, অর্থাৎ আয়ের চেয়ে ব্যয় মাত্র ৪৩ শতাংশ বেশি । রেলওয়ের যুক্তি, ২০১৬ সালের পর থেকে ট্রেনের ভাড়া বাড়ানো হয়নি, অথচ জ্বালানি, রক্ষণাবেক্ষণ সামগ্রী, আমদানি করা যন্ত্রাংশের দাম এবং বেতন-ভাতা বেড়েছে কয়েকগুণ। এই অবস্থায় রেলওয়েকে শুধু লোকসানি প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক নয় বলে মনে করছে কর্তৃপক্ষ ।
সব মিলিয়ে, পশ্চিমাঞ্চলের ১১টি ট্রেন ইজারার সিদ্ধান্তটি রেলওয়ের আর্থিক সংকট সামাল দেওয়ার একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। তবে এর সুফল সাধারণ যাত্রীরা কতটা পাবেন এবং ভাড়া বৃদ্ধির ঝুঁকি কতটা তৈরি হবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

