বগুড়ার ধুনটে বাবার ওপর অভিমান করে গ্যাস ট্যাবলেট খেয়ে খান সোহান (২০) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) দুপুরে চৌকিবাড়ী ইউনিয়নের বহালগাছা গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। তিনি ওই গ্রামের শফিকুল ইসলামের ছেলে।
সোহানের এমন অকাল মৃত্যুতে পরিবার, স্বজন ও স্থানীয়দের মধ্যে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পারিবারিক বিষয় নিয়ে বাবার সঙ্গে অভিমান করে দুপুর আনুমানিক ২টার দিকে সোহান গ্যাস ট্যাবলেট খেয়ে বাড়িতে আসেন। পরে বাবাকে দেখতে চাইলেও অভিমানের কারণে বাবা তার সঙ্গে দেখা করেননি।
জানা যায়, পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়রা তাকে ধুনট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিলে চিকিৎসক আশঙ্কাজনক অবস্থায় (শজিমেক) হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন। পরে শজিমেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
স্থানীয়রা জানান, সোহান খুব হাসি-খুশি স্বভাবের ছিল এবং নিজের আগ্রহ থেকেই সবার খোঁজ-খবর নিত। তার আচরণে সাধারণত প্রাণবন্ত ভাব লক্ষ্য করা যেত। মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগে সোহান ফেসবুক নোটে ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ লিখে একটি পোস্ট করেন এবং বিভিন্ন দেনা-পাওনাও পরিশোধ করে দেন।
স্থানীয়রা আরো জানান, কিছুদিন ধরে সোহান বিষণ্নতায় ভুগছিল। তার কথাবার্তায় অসঙ্গতি লক্ষ্য করা যেত এবং মাঝে মাঝে মনে হতো, সে জীবনকে অনেকটা বোঝা হিসেবে দেখছে। স্থানীয়দের ধারণা, পারিবারিক অবহেলা ও পর্যাপ্ত সহমর্মিতাপূর্ণ যোগাযোগের ঘাটতি তার মানসিক অবস্থার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
একটি প্রাণ, এক পরিবারের স্বপ্ন
একটি ‘বাবা’ ডাক আর শোনা হলো না…
বগুড়ার ধুনটের একটি মর্মান্তিক ঘটনা আজ পুরো বাংলাদেশকে কাঁদাচ্ছে। মাত্র ২০ বছরের এক তরুণ- একটি অভিমান, একটি আবেগঘন সিদ্ধান্ত, আর তারপর একটি পরিবারের সারাজীবনের কান্না।
সংবাদমাধ্যমের তথ্যানুযায়ী, পারিবারিক অভিমানের জেরে ওই তরুণ গ্যাস ট্যাবলেট সেবন করেন। অসুস্থ হওয়ার পর পরিবার তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তাকে আর বাঁচানো যায়নি। এই মৃত্যু শুধু একটি প্রাণের নয়; এটি একটি মা-বাবার স্বপ্ন, একটি পরিবারের হাসি এবং অসংখ্য না বলা কথারও মৃত্যু।
মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব বুঝতে হবে এখনই
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, মানসিক স্বাস্থ্যের সংকট অনেক সময় নীরবে বেড়ে ওঠে এবং তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান হয় না। দীর্ঘদিনের হতাশা, একাকীত্ব, পারিবারিক অশান্তি, আর্থিক চাপ কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা ধীরে ধীরে একজন মানুষকে এমন অবস্থায় নিয়ে যেতে পারে, যেখানে স্বাভাবিক জীবনযাপনও কঠিন হয়ে পড়ে।
বিশেষ করে তরুণদের ক্ষেত্রে সংকটের লক্ষণগুলো উপেক্ষিত থাকলে তা গুরুতর পরিণতি ডেকে আনতে পারে। তাই আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন, নিজেকে সবার কাছ থেকে গুটিয়ে নেওয়া, অতিরিক্ত হতাশা বা জীবনের প্রতি অনাগ্রহের মতো বিষয়গুলোকে হালকাভাবে না দেখে শুরুতেই গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
আমরা কোথায় ভুল করছি?
আজ আমাদের সন্তানদের হাতে স্মার্টফোন আছে, কিন্তু অনেকের মনে অবস্থা মন দিয়ে শোনার মানুষ নেই। তারা ভালো ফলাফলের চাপ, পারিবারিক ভুল বোঝাবুঝি, সম্পর্কের কষ্ট বা ব্যর্থতার ভার একাই বহন করে। অনেক সময় তারা মরতে চায় না- তারা শুধু যন্ত্রণাটা থামাতে চায়।
এক্ষেত্রে অভিভাবকদেরও সচেতন হওয়া জরুরি। সন্তানের রাগ-অভিমানকে অবহেলা না করে শাসনের আগে তার কষ্ট ও সমস্যার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা প্রয়োজন। প্রতিদিন অন্তত কিছুটা সময় সন্তানের সঙ্গে কথা বলা এবং তার অনুভূতিগুলো বোঝার চেষ্টা করা গুরুত্বপূর্ণ।
কোনো সন্তান যদি বলে, ‘আমার আর বাঁচতে ইচ্ছে করছে না’, তাহলে বিষয়টিকে নাটক বা সাময়িক আবেগ হিসেবে উড়িয়ে না দিয়ে গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত পরিবার, চিকিৎসক বা মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সহায়তা নেওয়া উচিত।
প্রিয় তরুণ-তরুণীদের জন্য
যত বড় সমস্যাই হোক, বিশ্বাস করুন – এটি চিরস্থায়ী নয়। আজ যে অন্ধকার অসহনীয় মনে হচ্ছে, কাল তার ভেতরেও আলো আসতে পারে। তাই কোনো স্থায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে “আপনার কী কষ্ট হচ্ছে, কেন জীবনকে বোঝা মনে হচ্ছে? – সেই কথাগুলো মন খুলে কাছের কোন মানুষকে বলুন।
আপনার এমন উদ্বেগ ও কষ্টের কথাগুলো কাউকে জানানোই হয়তো আপনার জীবন বাঁচাতে পারে।”
ইসলামের শিক্ষা
আল্লাহ তা’আলা বলেন: “তোমরা নিজেদের হত্যা করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু।” – সূরা আন-নিসা, আয়াত-২৯।
জীবন আল্লাহর দেওয়া সর্বশ্রেষ্ঠ আমানত। তাই বিপদে সাহায্য চাওয়া দুর্বলতা নয়, বরং সাহস।
জরুরি বার্তা
যদি আপনার পরিচিত কেউ আত্মহত্যার ইঙ্গিত দেয়, বিদায়ের মতো কথা বলে বা নিজের ক্ষতি করার কথা জানায়- তাহলে অবশ্যই তাকে একা রাখবেন না। দ্রুত পরিবারের সদস্য, চিকিৎসক বা নিকটস্থ স্বাস্থ্যসেবার সহায়তা নিন।
জরুরি বিপদের আশঙ্কা থাকলে বাংলাদেশের জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল করুন।
আসুন, পরিবার ও সমাজে একে অন্যের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনি, কষ্ট ও অভিমানকে অবহেলা না করি। আর কোনো সন্তানের শেষ কান্না যেন অভিমানের কাছে হারিয়ে না যায়, সেদিকে নজর রাখি। মানসিক স্বাস্থ্য সংকট প্রতিরোধে সচেতনতা বাড়াই এবং সহমর্মী সমাজ গড়ে তুলি।

