গাড়ির চাকায় পিষ্ট হয়ে একজন মানুষের মৃত্যু আর তার ৪৮ ঘণ্টা পার হওয়ার আগেই সেই মৃত্যুকে ঘিরে ‘আপস-মীমাংসা’!
বারিধারার ডিপ্লোম্যাটিক জোনের ১ নম্বর সড়কের ফুটপাতে বিশ্রামরত ২৪ বছর বয়সী নির্মাণশ্রমিক মেহেদী হাসানকে গাড়িচাপা দিয়ে হত্যার ঘটনায় এমন একটি আপসনামার ছবি সামনে এসেছে। নথিটিতে ৯ লাখ টাকা দেওয়ার কথা উল্লেখ আছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। ছবিটি সত্যতা ও আইনি প্রক্রিয়ার সঙ্গে কীভাবে সম্পর্কিত—তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের বিষয়। কিন্তু প্রশ্নটি তার চেয়েও বড়।
একজন মানুষ মারা গেলেন। আর তার জীবনের মূল্য কি ৯ লাখ টাকা?
আইনের চোখে সব জীবনের মূল্য সমান
টাকার অঙ্ক দিয়ে মানুষের জীবনের মূল্য নির্ধারণ করা যায় না। একজন নির্মাণশ্রমিকের জীবন হয়তো সমাজের চোখে একজন ধনী মানুষের জীবনের চেয়ে কম দৃশ্যমান; কিন্তু আইনের চোখে নাগরিকের জীবনের মূল্য কম-বেশি হওয়ার কথা নয়।
বাংলাদেশের আইনে বেপরোয়া বা অবহেলাজনিত গাড়ি চালনায় মৃত্যু অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। সড়ক পরিবহণ আইন, ২০১৮-এর ১০৫ ধারাতেও এ ধরনের প্রাণহানির জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে। একই সঙ্গে আইনে দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তির পরিবারকে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
ক্ষতিপূরণ আর অপরাধের দায় এক জিনিস নয়
কোনো পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হতে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার তাদের ন্যায্য পাওনা পেতে পারে। কিন্তু অর্থ দিয়ে যদি ফৌজদারি অপরাধের দায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে মুছে ফেলা যায়, তাহলে আইনের শাসনের জায়গাটি কোথায়?
বাংলাদেশের ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪৫ ধারায় নির্দিষ্ট কিছু অপরাধ আপসযোগ্য হিসেবে নির্ধারিত আছে; অর্থাৎ সব অপরাধ ব্যক্তিগত সমঝোতার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা যায় না। দণ্ডবিধির ৩০৪ (B) ধারায় বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে সংঘটিত মৃত্যু আপসযোগ্য নয় হিসেবে উল্লেখ রয়েছে।
সুতরাং মেহেদী হাসানের পরিবারের সঙ্গে কোনো অর্থনৈতিক সমঝোতা হয়ে থাকলেও, সেটি নিজে থেকেই একটি প্রাণহানির ফৌজদারি দায় শেষ করে দেয়—এমন ধারণা আইনের কাঠামোর সঙ্গে মেলে না। সংশ্লিষ্ট ঘটনায় কোন ধারায় মামলা হয়েছে, আদৌ মামলা হয়েছে কি না, চালকের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ রয়েছে এবং কথিত আপসনামার আইনি অবস্থান কী—এসব অবশ্যই তদন্ত ও আদালতের মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়া প্রয়োজন।

যাঁর কণ্ঠস্বর সবচেয়ে ক্ষীণ, তিনিই সবচেয়ে অরক্ষিত
কিন্তু আমাদের সামাজিক বাস্তবতার প্রশ্নটি আরও নির্মম।
মেহেদী ছিলেন নির্মাণশ্রমিক। তিনি ফুটপাতে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। তাঁর হাতে হয়তো দামি ঘড়ি ছিল না, পকেটে ক্ষমতার পরিচয়পত্র ছিল না, তাঁর পরিবারের পেছনে হয়তো কোনো প্রভাবশালী মানুষ দাঁড়িয়ে ছিলেন না। তিনি ছিলেন সেই শ্রেণির মানুষ, যারা শহরের ভবন নির্মাণ করে, রাস্তা বানায়, অন্যের বাড়ি দাঁড় করায়—কিন্তু নিজের জীবনের নিরাপত্তাটুকু নিশ্চিত করতে পারে না।
অন্যদিকে গাড়ি যদি হয় ক্ষমতা, অর্থ কিংবা সামাজিক প্রভাবের প্রতীক, তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—আইন কি সবার জন্য সমান, নাকি মৃত্যুর পরও মানুষের আর্থিক অবস্থান অনুযায়ী ন্যায়বিচারের দরদাম হয়?
৯ লাখ টাকা কোনো পরিবারের কাছে বড় অর্থ হতে পারে। শোকাহত, অসহায় একটি পরিবার হয়তো পরিস্থিতির চাপে সেই অর্থ গ্রহণ করতেও পারে। কিন্তু পরিবারের আর্থিক দুর্বলতাকে যদি অপরাধীর দায়মুক্তির পথ হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তাহলে সেটি শুধু একটি পরিবারের সঙ্গে অন্যায় নয়—পুরো সমাজের জন্য ভয়ংকর বার্তা।
কারণ তখন বার্তাটি দাঁড়ায়—গরিব মানুষকে গাড়িচাপা দিয়ে মেরে ফেললে ক্ষতিপূরণের টাকা জোগাড় করুন, আর মামলা মিটিয়ে ফেলুন।
এমন সংস্কৃতি তৈরি হলে রাস্তায় মানুষের জীবন আরও সস্তা হয়ে যাবে।
রাষ্ট্রের দায়িত্বও প্রশ্নের বাইরে নয়
এখানে রাষ্ট্রের দায়িত্বও প্রশ্নের বাইরে নয়। একটি নাগরিকের মৃত্যু শুধু তার পরিবারের ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়। বিশেষ করে যদি অভিযোগ হয় বেপরোয়া বা অবহেলাজনিত গাড়ি চালনায় একজন মানুষের মৃত্যু হয়েছে, তাহলে তদন্ত, আলামত সংগ্রহ, চালকের দায় নির্ধারণ এবং প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্বের অংশ।
মেহেদীর পরিবারের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার আছে। একই সঙ্গে অভিযুক্ত ব্যক্তিরও আইনি প্রক্রিয়ায় আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার আছে। কিন্তু এই দুইয়ের কোনোটিই গোপন সমঝোতা, প্রভাব কিংবা অর্থের বিনিময়ে আইনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে প্রতিস্থাপন করতে পারে না।
প্রশ্ন থেকে যায়
আমাদের প্রশ্ন তাই শুধু মেহেদীর পরিবারের জন্য নয়।
প্রশ্নটি সেই প্রতিটি পথচারীর জন্য, যে ফুটপাতে হাঁটে।
সেই প্রতিটি শ্রমিকের জন্য, যে দিনের শেষে রাস্তার পাশে বসে একটু বিশ্রাম নেয়।
সেই প্রতিটি পরিবারের জন্য, যার উপার্জনক্ষম মানুষটি প্রতিদিন ঘর থেকে বেরিয়ে আর ফিরে না-ও আসতে পারেন।
একটি প্রাণের দাম ৯ লাখ টাকা নয়। একটি প্রাণের দাম কোনো টাকা দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না।
ক্ষতিপূরণ হতে পারে টাকার অঙ্কে। কিন্তু ন্যায়বিচারের মূল্য টাকা দিয়ে নির্ধারিত হতে পারে না।
মেহেদীর মৃত্যু তাই শুধু একটি সড়ক দুর্ঘটনার ঘটনা নয়—এটি আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে: বাংলাদেশে আইন কি মানুষের জন্য, নাকি মানুষের আর্থিক ও সামাজিক অবস্থান অনুযায়ী আইনের দরজা খুলে-বন্ধ হয়?
এই প্রশ্নের উত্তর মেহেদীর পরিবার শুধু নয় বরঞ্চ রাষ্ট্র, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং বিচারব্যবস্থাকেই দিতে হবে।
উল্লেখ্য, যদিও দুই পক্ষের মধ্যে আর্থিক আপস হয়েছে, তবে ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৮ এর বিচারক আজ (২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬) অভিযুক্ত ১৭ বছর বয়সী কিশোর আজান আলী শরীফকে গাজীপুরের টঙ্গী শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে (সংশোধনাগার) পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন।

