এলিট ফোর্স র্যাব বিলুপ্তির পর গত ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করেছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন বা এসআরবি। নতুন একটি আইনের অধীনে গঠিত হলেও বাহিনীটির মূল কাঠামো ও কার্যক্রমে বড় কোনো পরিবর্তন আসেনি বলে জানা যাচ্ছে।
সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো পরিবর্তন এসেছে নাম ও পরিচিতিতে। সরকারি কাজে এখন থেকে “র্যাব”-এর জায়গায় ব্যবহৃত হচ্ছে “এসআরবি” নাম। এই পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বিধি প্রণয়নের কাজ চলছে এবং লোগো, পোশাক ও পতাকা বদলের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।
কী কী বদল হয়েছে, কী থেকেছে অপরিবর্তিত: বাহিনীর নেতৃত্ব, জনবল, স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ, ব্যাংক হিসাব, তহবিল, অবকাঠামো এবং সার্বিক কার্যক্রম—সবই নতুন সংস্থার অধীনে হস্তান্তরিত হয়েছে। তবে ফৌজদারি অপরাধ তদন্ত, তল্লাশি, গ্রেফতার, জব্দ, হাজতখানা ও জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ পরিচালনার মতো যেসব ক্ষমতা পুরোনো বাহিনীর হাতে ছিল, সেগুলোও মূলত অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
আইনি কাঠামোয় কী নতুনত্ব: নতুন একটি আইনের অধীনে যাত্রা শুরু করায় বাহিনীটি পুরোনো একটি অধ্যাদেশের আইনি সীমাবদ্ধতা থেকে বেরিয়ে এসেছে। নতুন আইনে নাগরিকদের অভিযোগ এবং সংস্থার ভেতরকার অসন্তোষ নিষ্পত্তির জন্য একটি অভিযোগ প্রতিকার কমিটি গঠনের বিধান রাখা হয়েছে।
পুরোনো বাহিনীর কাঠামো নিয়ে সবচেয়ে বড় বিতর্কের একটি বিষয় ছিল সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে যুক্ত করা। নতুন আইনেও এই সুযোগ অব্যাহত রাখা হয়েছে, যা নিয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সমালোচনা রয়েছে। বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ হলো, পুরোনো জনবল, অবকাঠামোগত সুবিধা এবং ক্ষমতা অক্ষুণ্ণ রেখে কেবল নাম ও আইন বদলে ফেলায় বাস্তবে মৌলিক কোনো রূপান্তরের সুযোগ সীমিত থেকে যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের অভিমত, শুধু নাম বদলে ফেললেই যুক্তরাষ্ট্রের মতো আন্তর্জাতিক পক্ষ বা মানবাধিকার সংস্থাগুলোর কাছে এই সংস্থা ঝুঁকিমুক্ত বিবেচিত হবে না—তারা বরং এটিকে পুরোনো বাহিনীরই ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখতে পারে। একজন সাবেক রাষ্ট্রদূতের মতে, বিদেশি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার একটি দীর্ঘ ও সুনির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঘটে, কেবল নাম পরিবর্তনে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয় না, এবং নতুন সংস্থার কার্যক্রমের ওপর সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো নজর রাখবে বলে তিনি মনে করেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন সিনিয়র কর্মকর্তার ভাষ্য, কড়া তদারকি ও জবাবদিহির নতুন বিধান অতীতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের পুনরাবৃত্তি রোধে সহায়ক হবে। নতুন সংস্থার মহাপরিচালকও জানিয়েছেন, নাম বদলালেও কাজের ধারাবাহিকতায় কোনো ব্যাঘাত ঘটেনি, বরং জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধির দিকেই তারা এগোচ্ছেন এবং বিদেশি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার নিয়ে আশাবাদী তারা।
তবে একজন পরিচিত মানবাধিকারকর্মীর মতে, কাগজে-কলমে পুরোনো বাহিনী বিলুপ্ত হলেও বাস্তবে নতুন সংস্থাটি পুরোনো বাহিনীরই নতুন মোড়ক মাত্র, কারণ দুটির মধ্যে মৌলিক কোনো পার্থক্য নেই।
২০০৪ সালে সেনাবাহিনী, পুলিশ, আনসার ও বিডিআরের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছিল এই এলিট বাহিনী, যা শুরুর দিকে সন্ত্রাস দমনে প্রশংসিত হলেও পরবর্তীতে বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম এবং গোপন বন্দিশালার মতো ঘটনায় ব্যাপক বিতর্কিত হয়ে ওঠে। ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র এই বাহিনী ও এর কয়েকজন কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর বাহিনীটি বিলুপ্তির দাবি জোরালো হয়ে ওঠে—যার পরিণতিতেই আসে এই নতুন সংস্থা।

