জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলা বিভাগের ভবন নির্মাণকাজ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলা বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে সোমবার একাধিকবার বিক্ষোভে অংশ নেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা। এই বিষয়টি নিয়ে উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়, যখন প্রশাসনিক ভবনের ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেন চারুকলার শিক্ষার্থীরা।
চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থীরা তাদের দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা ভবন নির্মাণের দাবিতে দুপুর থেকে নতুন প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান নেন। তাঁরা দাবি করেন, দ্রুত নির্মাণকাজ শুরু না হলে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হবে। দাবি আদায়ে তাঁরা শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ শুরু করেন। তবে প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা ফলপ্রসূ না হওয়ায় সন্ধ্যায় তাঁরা ভবনের ফটকে তালা দেন। ফলে ভেতরে বেশ কয়েকজন শিক্ষক ও কর্মকর্তা আটকে পড়েন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে রাত ৮টার দিকে উপাচার্য মোহাম্মদ কামরুল আহসান শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং ২৮ নভেম্বর তাঁদের দাবির বিষয়ে আলোচনা করার আশ্বাস দেন।
বিরোধী অবস্থান ও উত্তেজনা-
রাতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে, যখন বিভিন্ন বিভাগের একদল শিক্ষার্থী মিছিল নিয়ে এসে চারুকলার শিক্ষার্থীদের পেছনে অবস্থান নেন। মাস্টারপ্ল্যান চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত ভবন নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার দাবিতে তাঁরা স্লোগান দিতে থাকেন। তাঁদের অভিযোগ, চারুকলা ভবনের জন্য যেসব গাছ কাটা হয়েছে, তা পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
চারুকলা ভবনের পক্ষে থাকা শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, রাতে উসকানিমূলক স্লোগান দিয়ে তাঁদের আন্দোলনকে বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে। ৫০তম ব্যাচের শিক্ষার্থী রাঈদ হোসেন বলেন, ‘আমরা শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করছিলাম। কিন্তু হঠাৎ একদল শিক্ষার্থী এসে আমাদের টার্গেট করে স্লোগান দেয়। একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধেও অসম্মানজনক মন্তব্য করা হয়।’
অন্যদিকে নির্মাণকাজের বিরোধিতাকারী শিক্ষার্থীদের পক্ষে শহীদ সালাম-বরকত হলের জিয়াউদ্দিন আয়ান বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ-প্রকৃতি ধ্বংস করে ভবন নির্মাণ হতে পারে না। এটি অতিথি পাখির জন্য গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। মাস্টারপ্ল্যান ছাড়া নির্মাণ কাজ শুরু করলে তা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে।’
গাছ কাটা ও পরিবেশ বিপর্যয়ের অভিযোগ-
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ-ভারত যৌথ অর্থায়নে চলতি বছরের জুনে চারুকলা ভবনের নির্মাণকাজ শুরু হয়। কিন্তু যেখানে ভবন নির্মাণ হচ্ছে, সেটি অতিথি পাখির অভয়াশ্রম হিসেবে পরিচিত। নির্মাণের আগে ১৫০টিরও বেশি গাছ কাটা হয়, যা পরিবেশবাদীদের মধ্যে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
এ বিষয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বলেন, নির্মাণের দায়িত্বে থাকা শিক্ষক ময়েজউদ্দিনের মতো ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনা উচিত। অন্যদিকে পরিবেশবাদী শিক্ষার্থীরা দাবি করেন, ভারতের টাকায় কোনো নির্মাণকাজ হতে পারে না।
আন্দোলনের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি-
প্রশাসনের আশ্বাসে গত রাত সোয়া ১১টার দিকে চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থীরা হলে ফিরে যান। তবে বিরোধী পক্ষের শিক্ষার্থীরা সেখানেই মিছিল করেন এবং স্লোগান দেন।
২৮ নভেম্বর এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য চারুকলার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনায় বসার ঘোষণা দিয়েছেন উপাচার্য। তবে শিক্ষার্থীদের উভয় পক্ষের কঠোর অবস্থানের কারণে সমাধান কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এটি আরেকটি অধ্যায় হয়ে থাকবে, যেখানে উন্নয়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণের মধ্যকার দ্বন্দ্বের প্রতিফলন স্পষ্ট। শিক্ষার্থীদের আশা, আলোচনা ও সমঝোতার মধ্য দিয়ে একটি টেকসই সমাধান আসবে।

