মাগুরায় মাত্র ২৩৫ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিপরীতে ৫০৬ কোটি টাকার বেশি বিল পাঠানোর ঘটনায় কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে সরকার। মাগুরা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) মো. মহিতুল ইসলামকে তাৎক্ষণিক বরখাস্ত করা হয়েছে। একই ঘটনায় ভুক্তভোগী গ্রাহকের সঙ্গে ফোনে কথা বলে দুঃখ প্রকাশ করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।
ঘটনার শুরু সেপ্টেম্বর মাসের বিদ্যুৎ বিল ঘিরে। মাগুরা সদর উপজেলার মঘি ইউনিয়নের কেচুয়াডুবি গ্রামের বাসিন্দা মোছা. আলেয়া খাতুন বিলটি হাতে পেয়ে হতবাক হয়ে যান। তিনি ওই গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক শহীদুল ইসলামের স্ত্রী। বিলের কপি অনুযায়ী, এক মাসে তাঁর বিদ্যুৎ ব্যবহার হয়েছে ২৩৫ ইউনিট। অথচ এর বিপরীতে ডিমান্ড চার্জ দেখানো হয়েছে ৪৮২ কোটি ৬৯ লাখ ৬৩ হাজার ৪২২ টাকা। এর সঙ্গে ২৪ কোটি ১৩ লাখ ৪৮ হাজার ১৭১ টাকা ভ্যাট যোগ হয়ে মোট বিল দাঁড়ায় ৫০৬ কোটি ৮৩ লাখ ১১ হাজার ৫৯৩ টাকা।
নির্ধারিত সময়ে পরিশোধ না করলে বিলম্ব মাশুলসহ এই অঙ্ক হতো ৫৩০ কোটি ৯৬ লাখ ৫৯ হাজার ৭৬৪ টাকা। প্রকৃত হিসাবে ২৩৫ ইউনিটের বিল হওয়ার কথা ছিল মাত্র ১ হাজার ৯৬৩ টাকা। বিলম্ব মাশুলসহ তা দাঁড়াত ২ হাজার ৫৬ টাকা। বিলটি ইস্যু হয় ১০ সেপ্টেম্বর। পরিশোধের শেষ তারিখ ছিল ২৯ সেপ্টেম্বর। বিলে গ্রাহকের শ্রেণি উল্লেখ ছিল ‘এলটি-এ (আবাসিক)’।
ক্ষুব্ধ গ্রাহক আলেয়া খাতুন বলেছিলেন, এটি শুধু ভুতুড়ে নয়, আজগুবি বিলও। তাঁর মতে, বিদ্যুৎ বিভাগের খামখেয়ালিপনায় গ্রাহকের দুশ্চিন্তা ও ভোগান্তি বাড়ছে। এ ধরনের ভুলের প্রতিকার জরুরি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
শালিখা উপজেলার চুকিনগরে মাগুরা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আড়পাড়া জোনাল অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) মো. রেজাউল করিম ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছেন। তাঁর ব্যাখ্যা, মিটার বদলের সময় ভুলবশত মিটারের সিল নম্বরের অঙ্কগুলো ডিমান্ড চার্জের ঘরে বসে যায়। এতেই অস্বাভাবিক এই বিল তৈরি হয়েছে। তিনি জানান, বিলটি সংশোধন করে গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। এই দায়িত্বহীন ভুলের পেছনে যাঁদের সম্পৃক্ততা রয়েছে, তদন্তে প্রমাণ মিললে তাঁদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
ঘটনার পর জিএম মহিতুল ইসলাম প্রথমে বলেছিলেন, টাইপিংয়ের ভুলের কারণে এমনটি হয়েছে। তিনি জানিয়েছিলেন, বিল সংশোধন করে দেওয়া হয়েছে এবং গ্রাহকও তা পরিশোধ করেছেন। ভুলের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থার কথাও তখন তিনি বলেছিলেন। পরে সেই জিএমকেই বরখাস্ত করা হয়।
এই ঘটনায় কয়েকটি বিষয় আলোচনায় এসেছে। প্রথমত, দ্রুত জবাবদিহি নিশ্চিত হওয়া ইতিবাচক। ঘটনা আলোচনায় আসার পর সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সাড়া মিলেছে। মন্ত্রীর সরাসরি গ্রাহকের সঙ্গে কথা বলা সাধারণ মানুষের কাছে একটি বার্তা দেয় যে সেবার ঘাটতি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, ভুলের ব্যাখ্যা নিয়ে ভিন্নতা রয়েছে। ডিজিএম বলেছেন, মিটার বদলের সময় সিল নম্বরের অঙ্ক ভুল ঘরে বসেছে। জিএম বলেছিলেন, টাইপিং ভুল। দুটি বক্তব্য একই ধরনের ডেটা এন্ট্রির ভুলের দিকে ইঙ্গিত করলেও প্রকৃত কারণ তদন্তেই নিশ্চিত হবে।
তৃতীয়ত, শুধু একজন কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করলেই সমস্যার সমাধান হয় না। বিল তৈরির প্রক্রিয়ায় যাচাইয়ের ধাপ কেন কাজ করেনি, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। আবাসিক সংযোগের বিল কয়েক হাজার টাকার জায়গায় শত শত কোটি টাকা হলে সফটওয়্যারেই তা আটকে যাওয়ার কথা। সেই স্বয়ংক্রিয় সতর্কতা ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
চতুর্থত, দায় কার ওপর বর্তায়, তা স্পষ্ট হওয়া দরকার। মিটার বদলের কাজ যিনি করেছেন, তথ্য যিনি বসিয়েছেন এবং বিল যাচাই করেছেন, তাঁদের ভূমিকা তদন্তে বেরিয়ে আসা উচিত। নইলে ভুলের দায় শুধু শীর্ষ পদে সীমিত থাকলে মাঠপর্যায়ের দুর্বলতা থেকেই যাবে।
সব মিলিয়ে ঘটনাটি দেখিয়েছে, কারিগরি ভুল কীভাবে একটি পরিবারকে ভয়াবহ দুশ্চিন্তায় ফেলতে পারে। দ্রুত পদক্ষেপ প্রশংসনীয় হলেও তদন্তের ফল প্রকাশ, প্রক্রিয়াগত সংস্কার ও অস্বাভাবিক বিল আটকানোর ব্যবস্থা চালুই ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকানোর নিশ্চিত পথ।

