বাংলাদেশে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত চিত্র বোঝার ক্ষেত্রে বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে বলে মনে করছেন গবেষকরা। কারণ পুলিশের অপরাধ পরিসংখ্যানে সাধারণত কতজন মানুষ নিহত হয়েছেন তা নয়, বরং কতটি হত্যা মামলা হয়েছে সেটিই মূল হিসাব হিসেবে ধরা হয়।
ফলে একটি ঘটনায় একাধিক ব্যক্তি নিহত হলেও সরকারি পরিসংখ্যানে সেটি একটি মামলা হিসেবেই দেখা যায়। যেমন, রংপুরে একই পরিবারের চার সদস্য হত্যার ঘটনা ঘটলেও পুলিশের মাসিক অপরাধ পরিসংখ্যানে তা একটি হত্যা মামলা হিসেবেই থাকবে। সেখানে চারজন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন—এই তথ্য আলাদাভাবে প্রতিফলিত হবে না।
এই পদ্ধতির কারণে দেশে সহিংসতা কোথায় বেশি, কোন সময়ে হত্যাকাণ্ড বাড়ে, কঠোর শাস্তির প্রভাব অপরাধ কমাতে কতটা কার্যকর—এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর বের করা কঠিন হয়ে পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অসম্পূর্ণ তথ্যের ওপর ভিত্তি করে নীতি নির্ধারণ করলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের কার্যকর পরিকল্পনা তৈরি করা কঠিন হয়। গবেষক, নীতিনির্ধারক এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও সঠিক বিশ্লেষণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়।
বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ পরিসংখ্যানে প্রতি মাসে বিভিন্ন অপরাধের মামলার সংখ্যা প্রকাশ করা হয়। তবে এসব তথ্য মূলত মামলার ভিত্তিতে তৈরি হয়, ঘটনার প্রকৃত সময় বা নিহত ব্যক্তির সংখ্যা সবসময় এতে প্রতিফলিত হয় না।
অনেক ক্ষেত্রে হত্যাকাণ্ডের মামলা ঘটনার অনেক পরে দায়ের হয়। কোনো সন্দেহজনক মৃত্যু প্রথমে অস্বাভাবিক মৃত্যু হিসেবে নথিভুক্ত হতে পারে এবং পরে সেটি হত্যা মামলা হিসেবে রূপ নিতে পারে। আবার অনেক ঘটনা কখনো হত্যা মামলা হিসেবেও নথিভুক্ত হয় না।
ফলে কোনো ঘটনার প্রকৃত সময় এবং মামলা হওয়ার সময়ের মধ্যে পার্থক্য তৈরি হয়। একটি পুরোনো হত্যাকাণ্ডের মামলা চলতি মাসে দায়ের হলে সেটি ওই মাসের অপরাধ হিসেবেই গণনা করা হয়।
বাংলাদেশ পুলিশের একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, বর্তমানে অপরাধ পরিসংখ্যান তৈরিতে এই পদ্ধতিই অনুসরণ করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউ হ্যাভেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিচার ও অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের গবেষক নীখিল চন্দ্র নাথ বলেন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জন্য সাধারণত মামলা নথিই বিশ্লেষণের মূল ভিত্তি। তবে প্রকৃত অপরাধের চিত্র বোঝার জন্য শুধু মামলা নির্ভর তথ্য ব্যবহার করলে বড় সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়।
আন্তর্জাতিকভাবে অনেক দেশ হত্যার হিসাব করার ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীকে মূল একক হিসেবে বিবেচনা করে। জাতিসংঘের অপরাধ পরিসংখ্যানের আন্তর্জাতিক শ্রেণিবিন্যাসেও মৃত্যুর ঘটনায় ভুক্তভোগীর সংখ্যাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাজ্য ও ওয়েলসে প্রতিটি নিহত ব্যক্তিকে আলাদা রেকর্ড হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়। সেখানে বয়স, লিঙ্গ, হত্যার পদ্ধতি এবং অভিযুক্তের সঙ্গে সম্পর্কের মতো তথ্যও রাখা হয়।
কানাডার পরিসংখ্যান ব্যবস্থায় অপরাধের ঘটনার তারিখ আলাদাভাবে সংরক্ষণ করা হয় এবং পরে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী পুরোনো পরিসংখ্যান সংশোধন করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রেও আগে অপরাধ গণনায় সীমাবদ্ধতা ছিল। দেশটির পুরোনো পদ্ধতিতে একটি ঘটনায় সবচেয়ে গুরুতর অপরাধটিই শুধু গণনা করা হতো। পরে ২০২১ সাল থেকে নতুন ব্যবস্থায় প্রতিটি অপরাধ, ভুক্তভোগী এবং ঘটনার তারিখ আলাদাভাবে নথিভুক্ত করা হচ্ছে।
ভারতের জাতীয় অপরাধ রেকর্ড ব্যুরো হত্যা মামলার পাশাপাশি ভুক্তভোগীর সংখ্যাও প্রকাশ করে। তবে সেখানেও একাধিক অপরাধের ঘটনায় সবচেয়ে গুরুতর অপরাধকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
গবেষকদের মতে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে শুধু সংখ্যা প্রকাশ করলেই হবে না, তথ্যের ধরনও পরিবর্তন করতে হবে। কতটি মামলা হয়েছে এবং কতজন মানুষ নিহত হয়েছেন—এই দুটি বিষয় আলাদাভাবে প্রকাশ করা প্রয়োজন।
নীখিল চন্দ্র নাথ বলেন, মামলা সংখ্যার পরিবর্তে প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা জানতে হলে তথ্য সংশোধনের ব্যবস্থা দরকার। একটি নির্দিষ্ট সময়ের মামলা বিশ্লেষণ করে প্রকৃত হত্যার সংখ্যা এবং নথিভুক্ত মামলার মধ্যে পার্থক্য বের করা সম্ভব।
তার মতে, পুলিশ, গণমাধ্যম, মানবাধিকার সংস্থা এবং অন্যান্য উৎসের তথ্য মিলিয়ে প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা অনুমান করার পদ্ধতিও ব্যবহার করা যেতে পারে।
অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত ডিআইজি এবং জাতীয় নিরাপত্তা সেলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মজহারুল হক বলেন, পুলিশের জন্য তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যত বেশি নির্ভুল তথ্য থাকবে, অপরাধের ধরন বিশ্লেষণ এবং কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া তত সহজ হবে।
তিনি বলেন, বর্তমানে পুলিশের মধ্যে গবেষণাভিত্তিক সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
জাপানের কোবান ব্যবস্থা এবং সিঙ্গাপুরের স্থানীয় পুলিশ ব্যবস্থার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, এসব দেশে স্থানীয় পর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ অপরাধ নিয়ন্ত্রণের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
তবে তথ্য সংগ্রহ ও প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করাও জরুরি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের বর্তমান অপরাধ পরিসংখ্যান পদ্ধতি পুরোপুরি বাদ না দিয়ে এর পাশাপাশি একটি আলাদা ভুক্তভোগীভিত্তিক তথ্যব্যবস্থা তৈরি করা যেতে পারে।
ক্রাইসিস ডকুমেন্টেশন সেন্টারের প্রধান সমন্বয়ক দেওয়ান তাহমিদ বলেন, এমন একটি সমান্তরাল ব্যবস্থা তৈরি করা হলে অপরাধ সংঘটনের প্রকৃত সময় অনুযায়ী তথ্য হালনাগাদ করা সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে তথ্য প্রকাশ করা এবং তা সহজে ডাউনলোডযোগ্য করা হলে গবেষক ও নীতিনির্ধারকদের জন্য তা অনেক বেশি কার্যকর হবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে বাংলাদেশে একটি জাতীয় ভুক্তভোগী জরিপ চালু করা হলে অপরাধের প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্টভাবে বোঝা সম্ভব হবে। কারণ সঠিক তথ্য ছাড়া কার্যকর অপরাধ নিয়ন্ত্রণ নীতি তৈরি করা কঠিন।

