চট্টগ্রাম ওয়াসার সরবরাহ করা পানিতে ট্রাইহ্যালোমিথেন বা টিএইচএম নামের একধরনের রাসায়নিক যৌগের উপস্থিতি পেয়েছেন গবেষকেরা। ১২০টি নমুনা পরীক্ষা করে চার ধরনের টিএইচএম মিলেছে। গরমের সময় কিছু নমুনায় এর মাত্রা ছিল বেশি। অথচ ওয়াসা নিজে এই রাসায়নিক পরীক্ষাই করে না। সংস্থাটি স্বীকার করেছে, এ পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষ যন্ত্র তাদের পরীক্ষাগারে নেই।
গবেষণাটি চলতি বছরের জুনে নেদারল্যান্ডসের জার্নাল অব এনভায়রনমেন্টাল কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষক দলে আছেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) অধ্যাপক মোছা. ফারজানা রহমান, গবেষক ফারজানা খান এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক মো. দেলোয়ার হোসেন। চট্টগ্রাম ওয়াসার কর্ণফুলী পানি সরবরাহ এলাকার ১০টি অংশ থেকে এসব নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিল। গবেষকদের দাবি, চট্টগ্রামে সরাসরি পাইপলাইনের পানি পরীক্ষা করে টিএইচএমের উপস্থিতি ও তার সঙ্গে সম্পর্কিত ক্যানসারের ঝুঁকি নিয়ে এটিই প্রথম মাঠভিত্তিক গবেষণা।
টিএইচএম এমন একটি রাসায়নিক যৌগ, যা সরাসরি পানিতে মেশানো হয় না। পানি জীবাণুমুক্ত করতে ব্যবহৃত ক্লোরিন যখন নদীর পানিতে থাকা প্রাকৃতিক জৈব পদার্থের সঙ্গে বিক্রিয়া করে, তখন উপজাত হিসেবে এটি তৈরি হতে পারে। পচা পাতা, শেওলা এবং উদ্ভিদ ও প্রাণী থেকে তৈরি অন্যান্য জৈব পদার্থই এ বিক্রিয়ার উৎস। পানির তাপমাত্রা, জৈব পদার্থ, হ্যালাইড ও ক্লোরিনের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে কতটা টিএইচএম তৈরি হবে।
গবেষণায় যে চার ধরনের টিএইচএম পাওয়া গেছে, সেগুলো হলো ক্লোরোফর্ম, ব্রোমোডাইক্লোরোমিথেন, ডাইব্রোমোক্লোরোমিথেন ও ব্রোমোফর্ম। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল ক্লোরোফর্ম, মোট টিএইচএমের প্রায় ৬০ শতাংশ। এলাকাভেদে ক্লোরোফর্মের মাত্রা ছিল প্রতি লিটারে ৩১ দশমিক ৫ থেকে ৫২ দশমিক ৯ মাইক্রোগ্রাম। গরমের সময় কিছু নমুনায় চার ধরনের টিএইচএম মিলিয়ে মাত্রা প্রতি লিটারে ৭০ মাইক্রোগ্রামের বেশি ছিল। শীতে মাত্রা তুলনামূলক কম পাওয়া গেছে।
গবেষকেরা দীর্ঘদিন একই মাত্রার টিএইচএমযুক্ত পানি পান করলে ক্যানসারের ঝুঁকি কতটা বাড়তে পারে, তারও হিসাব করেছেন। তাঁদের হিসাবে প্রতি ১০ লাখ মানুষের মধ্যে আনুমানিক ৪২৬ জনের অতিরিক্ত ক্যানসারের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে ১০ লাখের মধ্যে ৪২৬ জন ক্যানসারে আক্রান্ত হবেন। কোনো ক্যানসার রোগীর ওপর এই গবেষণা করা হয়নি। পানিতে পাওয়া টিএইচএমের মাত্রা ধরে দীর্ঘদিন সেই পানি পান করলে ঝুঁকি কতটা বাড়তে পারে, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে কেবল সেই হিসাবই করা হয়েছে।
মানুষ শুধু পানি পানের মাধ্যমেই টিএইচএমের সংস্পর্শে আসে না। গোসল, রান্না বা পানি ব্যবহারের সময় এটি বাতাসে ছড়িয়ে শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে শরীরে যেতে পারে। ত্বকের মাধ্যমেও এটি শরীরে প্রবেশ করতে পারে। তাই গবেষকেরা পানি পান, শ্বাসপ্রশ্বাস ও ত্বক, এই তিন পথেই ঝুঁকি হিসাব করেছেন। এর মধ্যে পানি পানের মাধ্যমে ক্যানসারের সম্ভাব্য ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে। প্রতি ১০ লাখে ৪২৬ জনের অতিরিক্ত ঝুঁকির হিসাব সেখান থেকেই এসেছে।
অধ্যাপক ফারজানা রহমান প্রথম আলোকে বলেন, এই সংখ্যা দেখে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। তাঁর ভাষ্য, ক্ষতিকর জীবাণু ধ্বংস করতে ক্লোরিন প্রয়োজন। তাই টিএইচএম পাওয়া গেছে বলে শোধনে ক্লোরিনের ব্যবহার বন্ধ করা যাবে না। বরং শোধনের সময় পানিতে জৈব পদার্থ কমানো, প্রয়োজন অনুযায়ী ক্লোরিন ব্যবহার এবং নিয়মিত টিএইচএম পরীক্ষা করা দরকার। তিনি আরও মনে করেন, বাংলাদেশেও মোট টিএইচএমের একটি মানদণ্ড থাকা উচিত। শোধনাগার থেকে গ্রাহকের বাসা পর্যন্ত বিভিন্ন জায়গায় নিয়মিত এই রাসায়নিক পরীক্ষা করা দরকার।
গবেষণায় পাওয়া তথ্য উল্লেখ করে ওয়াসার কাছে লিখিত প্রশ্ন পাঠিয়েছিল প্রথম আলো। জবাবে সংস্থাটি জানায়, গবেষণাটি নির্দিষ্ট ১০টি এলাকা ও নির্দিষ্ট সময়ের নমুনার ওপর করা হয়েছে। নমুনা কোথা থেকে এবং কীভাবে সংগ্রহ করা হয়েছে, তা নিয়েও তাদের প্রশ্ন আছে। ওয়াসার বক্তব্য, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মোট টিএইচএমের জন্য একক সীমা নির্ধারণ করেনি। চার ধরনের টিএইচএমের জন্য আলাদা নির্দেশক মান রয়েছে। গবেষণায় পাওয়া প্রতিটি টিএইচএমের গড় মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সংশ্লিষ্ট মানের নিচে বলে দাবি করেছে সংস্থাটি।
গবেষণার পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুললেও ওয়াসা স্বীকার করেছে, তারা নিজে টিএইচএম বা ক্লোরোফর্ম পরীক্ষা করে না। লিখিত বক্তব্যে সংস্থাটি জানায়, গ্রাহক পর্যায় থেকে প্রতি মাসে ২৪০টি নমুনা নিয়ে অবশিষ্ট ক্লোরিন ও কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়া পরীক্ষা করা হয়। শোধনাগারেও বিভিন্ন উপাদান পরীক্ষা হয়। কিন্তু গবেষকেরা যে টিএইচএম পরীক্ষার কথা বলছেন, তা এখনো হচ্ছে না। ওয়াসা আরও জানিয়েছে, পানি উৎপাদন নিয়ে সমীক্ষা করতে একটি কোরীয় পরামর্শক দল চট্টগ্রামে আসবে। তাদের টিএইচএমের বিষয়টিও পর্যালোচনা করতে বলা হবে।
গবেষণার তথ্য ও ওয়াসার বক্তব্য নিয়ে কথা হয় চুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক আসিফুল হকের সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, টিএইচএম পরীক্ষার ব্যবস্থা ওয়াসাকে করতেই হবে। এ ক্ষেত্রে কোনো ঝুঁকি নেওয়ার সুযোগ নেই। তাঁর মতে, শুধু শোধনাগারে পানির মান ঠিক রাখলেই হবে না। গ্রাহকের বাসায় পৌঁছানো পর্যন্ত পানি নিরাপদ আছে কি না, সেটিও নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে।

