ঢাকার যানজট কমানো এবং দ্রুত গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে নেওয়া দেশের প্রথম বাস র্যাপিড ট্রানজিট বা বিআরটি প্রকল্প এখন বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। গাজীপুর থেকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত এই প্রকল্পে ইতোমধ্যে ২ হাজার ৮১০ কোটি টাকা খরচ হলেও এখন সরকার প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবছে।
দীর্ঘদিন ধরে অসমাপ্ত অবস্থায় পড়ে থাকা এই প্রকল্প চালু করা হবে, নাকি অন্য কোনো ব্যবহারে নেওয়া হবে—এ নিয়ে চারটি বিকল্প বিবেচনা করছে সরকার। এর মধ্যে একটি বিকল্প হলো বিদ্যমান বিআরটি ব্যবস্থা সম্পন্ন করা, আরেকটি হলো রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি পদ্ধতিতে পরিচালনা করা। এছাড়া করিডোরটিকে এক্সপ্রেসওয়েতে রূপান্তর করা অথবা বিআরটির অবকাঠামো ভেঙে সাধারণ মহাসড়ক হিসেবে ব্যবহার করার প্রস্তাবও আলোচনায় রয়েছে।
২০১২ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল গাজীপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য গণপরিবহন ব্যবস্থা তৈরি করা। ২০ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই করিডোরে আলাদা বাস লেন তৈরি করা হয়েছিল, যাতে সাধারণ যানজট এড়িয়ে যাত্রীরা দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন।
তবে দীর্ঘ ১৪ বছর পরও বিআরটি সেবা চালু করা সম্ভব হয়নি। প্রকল্পের অবকাঠামোগত কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছালেও মূল সেবা অর্থাৎ বিআরটি বাস চলাচল শুরু হয়নি।
প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত অবকাঠামোগত কাজের ৯৭ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছিল। তবে পুরো প্রকল্পের সামগ্রিক অগ্রগতি ছিল ৭৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ। এরপর থেকে প্রকল্পের মেয়াদ আর বাড়ানো হয়নি।
বর্তমানে নির্মিত বিআরটি লেনগুলোতে সাধারণ যানবাহন চলাচল করছে। ফলে যে উদ্দেশ্যে আলাদা বাস করিডোর তৈরি করা হয়েছিল, সেই সুবিধা বাস্তবে পাওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে দীর্ঘদিন ব্যবহারের বাইরে থাকায় অনেক স্টেশন ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বিআরটি প্রকল্পের প্রধান আকর্ষণ ছিল বিশেষায়িত বাস সেবা। কিন্তু বাস কেনার উদ্যোগ দুইবার ব্যর্থ হওয়ায় এখনো যাত্রী পরিবহন শুরু করা যায়নি।
প্রথমে বৈদ্যুতিক বাস চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। তবে দরপত্র বাতিল হওয়ার পর সেই উদ্যোগ বন্ধ হয়ে যায়। পরে ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে ১৩৭টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ডিজেল বাস কেনার জন্য নতুন দরপত্র আহ্বান করা হয়। কিন্তু দ্বিতীয় উদ্যোগও সফল হয়নি।
ঢাকা বাস র্যাপিড ট্রানজিট পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহাম্মদ নুরুল আমিন খান জানিয়েছেন, প্রকল্পটি ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের অবস্থাতেই রয়েছে। বর্তমানে কোনো সক্রিয় মেয়াদ না থাকায় নতুন কাজ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি জানান, সরকারের সিদ্ধান্তের পর ক্ষতিগ্রস্ত করিডোর মেরামতের কাজ শুরু করা হবে।
প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নিয়ে যে চারটি বিকল্প বিবেচনা করা হচ্ছে, তার প্রথমটি হলো বাকি অবকাঠামোগত কাজ শেষ করে বিআরটি চালু করা। এর মধ্যে বাস সংগ্রহ এবং আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি যুক্ত করার বিষয়ও রয়েছে।
দ্বিতীয় বিকল্প হলো বিদ্যমান স্টেশন, টার্মিনাল ও ডিপো ব্যবহার করে সীমিত বিনিয়োগে রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবস্থা চালু করা। পরবর্তীতে ধাপে ধাপে পূর্ণাঙ্গ বিআরটি ব্যবস্থায় যাওয়া।
তৃতীয় বিকল্প হিসেবে করিডোরটিকে এক্সপ্রেসওয়েতে রূপান্তরের কথা বলা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে মাঝের লেনে দ্রুতগতির যানবাহন টোল দিয়ে চলবে এবং অন্য যানবাহনের জন্য সার্ভিস সড়ক ব্যবহার করা হবে।
চতুর্থ বিকল্প হলো বিআরটির অবকাঠামো সরিয়ে করিডোরটিকে সাধারণ মহাসড়কে পরিণত করা। এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে কার্যত পুরো বিআরটি প্রকল্প বাতিল হয়ে যাবে।
নুরুল আমিন খান জানিয়েছেন, চারটি প্রস্তাবের ভিত্তিতে একটি সারসংক্ষেপ তৈরি করা হয়েছে, যা মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের অপেক্ষায় রয়েছে।
এদিকে প্রকল্প এলাকার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ৩ অক্টোবর সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, অনেক জায়গায় বিআরটি স্টেশন ও যাত্রী ছাউনি ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় রয়েছে। কোথাও কোথাও এসব স্থানে গৃহহীন মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন।
উত্তরার বিভিন্ন এলাকায় সড়কের অবস্থা খারাপ হয়ে গেছে। কোথাও জমে আছে নোংরা পানি, কোথাও আবার মাটি, নির্মাণসামগ্রী ও আবর্জনা পড়ে রয়েছে। আবদুল্লাহপুর এলাকায় করিডোরের নিচে অস্থায়ী দোকান বসেছে এবং যান চলাচলে সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
টঙ্গীর শানারপাড় এলাকায় ঢাকা অভিমুখী করিডোরের একটি র্যাম্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে বাস ও মোটরসাইকেল চালকদের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে।
গাজীপুর–এয়ারপোর্ট বিআরটি প্রকল্পের মূল ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্প শেষ করার লক্ষ্য ছিল। কিন্তু সময় বাড়তে বাড়তে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ২৬৮ কোটি ৩২ লাখ টাকা।
এরপর প্রকল্পের মেয়াদ পাঁচবার বাড়ানো হয় এবং শেষ সময় নির্ধারণ করা হয় ২০২৪ সালের ডিসেম্বর। এর আগে আবারও প্রকল্প সংশোধনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। এতে ব্যয় বাড়িয়ে ৬ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকা এবং মেয়াদ ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করার প্রস্তাব করা হয়।
তবে ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় সংশোধিত প্রস্তাব অনুমোদন পায়নি। বরং দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে প্রকল্পটি পর্যালোচনার নির্দেশ দেওয়া হয়।
বিশেষজ্ঞদের মধ্যে কেউ কেউ বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবহার করে ধীরে ধীরে গণপরিবহন চালুর পক্ষে মত দিয়েছেন। আবার কেউ দ্রুত বাকি কাজ শেষ করে বিআরটি চালু করার পরামর্শ দিয়েছেন।
এই প্রকল্পে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক দিয়েছে ২ হাজার ১১৮ কোটি ৯৫ লাখ টাকা, ফরাসি উন্নয়ন সংস্থা দিয়েছে ৯০৩ কোটি ৪৯ লাখ টাকা এবং বাংলাদেশ সরকার দিয়েছে ১ হাজার ২৪৫ কোটি ৮৮ লাখ টাকা।
প্রকল্পের ঋণ পরিশোধ এখনো শুরু হয়নি। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের ঋণের মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বর এবং ফরাসি উন্নয়ন সংস্থার ঋণের মেয়াদ ২০২৭ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
বিআরটি প্রকল্প বাস্তবায়নে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর যৌথভাবে কাজ করছে।
তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের দীর্ঘসূত্রতা শুরু থেকেই যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়িয়েছে। নির্মাণকাজ চলাকালে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে দীর্ঘ যানজট, বায়ুদূষণ এবং শব্দদূষণের সমস্যায় পড়তে হয়েছে মানুষকে।
২০২২ সালের ১৫ আগস্ট উত্তরা এলাকায় এই প্রকল্পের নির্মাণস্থলে গার্ডার পড়ে একটি গাড়ির ওপর আঘাত করলে পাঁচজন নিহত হন। পরে তদন্তে উঠে আসে, যে ক্রেন দিয়ে গার্ডার তোলা হচ্ছিল সেটির ফিটনেস মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছিল এবং ঘটনার সময় প্রশিক্ষিত অপারেটরের পরিবর্তে সহকারী সেটি পরিচালনা করছিলেন।
গাজীপুর–এয়ারপোর্ট বিআরটি এখন বাংলাদেশের বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর মধ্যে একটি, যার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে। হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পর প্রকল্পটি চালু হবে, নাকি অন্য কোনো ব্যবহারে চলে যাবে—এখন সেই সিদ্ধান্তের দিকেই তাকিয়ে আছে সংশ্লিষ্ট সবাই।

