সাইকেল চালানো শুধু যাতায়াতের উপায় নয়, সুস্থ থাকারও অন্যতম কার্যকর পথ, বলেছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। শুক্রবার দুপুরে চট্টগ্রাম বিমানবন্দর সড়কের (ভিআইপি রোড) উন্নয়ন ও দেশের প্রথম সাইকেল ট্র্যাকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। নাগরিকদের জন্য নিরাপদ সাইকেল ট্র্যাক, হাঁটার পথ ও উন্মুক্ত পরিসর তৈরি করা সরকারের দায়িত্বের অংশ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মন্ত্রী বলেন, বিশ্বের অনেক দেশে মানুষ সাইকেলে চড়ে কর্মস্থলে যান। সাইক্লিং পরিবেশবান্ধব এবং শারীরিক সুস্থতা ধরে রাখতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। চট্টগ্রাম নগরে সাইকেল চালানো ও হাঁটার সুযোগ বাড়াতে সিটি করপোরেশনের মেয়রের উদ্যোগকে তিনি প্রশংসনীয় বলে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, বিমানবন্দর সড়কের এই ট্র্যাক কেবল শুরু। ধাপে ধাপে নগরের বিভিন্ন এলাকায় আরও সাইকেল ট্র্যাক ও ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা দরকার।

আমির খসরু আরও বলেন, হাঁটার জায়গা, সাইকেলের পথ ও খোলা পরিসর কোনো বিলাসিতা নয়, এগুলো দৈনন্দিন জীবনের মৌলিক চাহিদা। মানুষকে ঘরে বন্দি রেখে সুস্থ ও সুন্দর জীবন নিশ্চিত করা যায় না। তিনি নগরের খালের দুই পাড়সহ উপযুক্ত জায়গায় হাঁটার পথ তৈরির উদ্যোগ নিতে বলেন। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যদের নিজ নিজ এলাকায় এ ধরনের নাগরিক সুবিধা বাড়াতে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। তিনি বলেন, দেশের প্রথম সাইকেল ট্র্যাক নির্মাণ চট্টগ্রামের জন্য গর্বের অর্জন। ট্র্যাকটি প্রায় তিন কিলোমিটার দীর্ঘ। এর পাশাপাশি হাঁটার পথও করা হয়েছে এবং সড়কের দুই পাশে নানা প্রজাতির ফুলগাছ লাগিয়ে সৌন্দর্যবর্ধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মেয়রের ভাষ্য, বিমানবন্দর এলাকা থেকে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে পর্যন্ত সড়কের উন্নয়ন ও সৌন্দর্যবর্ধন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নাগরিকদের সাইক্লিং ও হাঁটার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এ কাজে অর্থমন্ত্রীর পরামর্শ ও উৎসাহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
মেয়র জানান, বড় সড়কের পাশাপাশি খালকেন্দ্রিক উন্নয়নেও সাইকেল ট্র্যাক ও ওয়াকওয়ে করার সম্ভাবনা আছে। খালের দুই পাড়ে প্রয়োজনীয় জায়গা পাওয়া গেলে সেখানে হাঁটার পথ, সাইক্লিংয়ের সুবিধা ও সবুজায়ন সম্ভব। এতে নগরবাসীর শরীরচর্চার সুযোগ বাড়বে এবং শহরের সৌন্দর্যও বাড়বে।
অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণের ওপরও জোর দেন মেয়র। তাঁর কথা, শুধু প্রকল্প বাস্তবায়ন করলেই চলবে না, সেগুলো রক্ষার দায়িত্বও নিতে হবে। অবৈধ দখল, স্থাপনা বা অন্য প্রতিবন্ধকতায় ট্র্যাক ও ওয়াকওয়ে যেন অকার্যকর হয়ে না পড়ে, সে জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মিত তদারকি করতে হবে। গাছের পরিচর্যা ও পরিচ্ছন্নতার কাজও অব্যাহত রাখতে হবে। তিনি আরও জানান, বিমানবন্দর সড়ক থেকে দেওয়ানহাট পর্যন্ত সড়কের স্থায়িত্ব বাড়াতে আরসিসি সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা আছে। বন্দরের ভারী যানবাহনের চাপ সামলাতে এবং সড়কের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে সিটি করপোরেশন কাজ করছে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম-৮ আসনের সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ, চট্টগ্রাম-৯ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান এবং চট্টগ্রাম-১২ আসনের সংসদ সদস্য এনামুল হক এনাম। উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম ওয়াসার চেয়ারম্যান ইদ্রিস মিয়া, ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সেলিম মোহাম্মদ জানে আলম, সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সচিব মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন, প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন শামীম মোহাম্মদ খান, প্রধান প্রকৌশলী আনিসুর রহমান, নির্বাহী প্রকৌশলী আশিকুল ইসলাম ও সহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আলীসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা, সাইক্লিস্ট ও রাজনৈতিক নেতারা।
দেশের শহরগুলোতে সড়ক মানেই এতদিন মূলত যানবাহনের জায়গা। হাঁটা ও সাইকেলের জন্য আলাদা পথ প্রায় ছিলই না। সেদিক থেকে তিন কিলোমিটারের এই ট্র্যাক ছোট হলেও একটি দৃষ্টান্ত তৈরি করল। ঘনবসতিপূর্ণ নগরে শরীরচর্চার জায়গার অভাব, যানজট ও বায়ুদূষণের মতো সমস্যার মধ্যে এ ধরনের উদ্যোগ নগরবাসীর জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে প্রকল্পের আসল পরীক্ষা উদ্বোধনের পরে। মেয়র নিজেই দখল ও রক্ষণাবেক্ষণের ঝুঁকির কথা বলেছেন। দেশে ফুটপাত ও খালপাড়ের জায়গা দখল হয়ে যাওয়ার নজির অনেক। ট্র্যাকে মোটরসাইকেল বা পার্কিং ঢুকে পড়া ঠেকানো, নিরাপত্তা ও আলোর ব্যবস্থা এবং নিয়মিত পরিচর্যা নিশ্চিত না হলে এটি দ্রুত অকেজো হয়ে যেতে পারে। অন্য এলাকায় ও খালপাড়ে সম্প্রসারণের কথা এখনো ঘোষণার পর্যায়ে আছে। এর জন্য সময়সীমা, বরাদ্দ বা নির্দিষ্ট পরিকল্পনা জানানো হয়নি।
সব মিলিয়ে চট্টগ্রামের এই উদ্যোগ দেখাচ্ছে, নগর পরিকল্পনায় মানুষের হাঁটা ও সাইকেলের জায়গাকেও গুরুত্ব দেওয়ার ভাবনা শুরু হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, প্রতিশ্রুত সম্প্রসারণ কত দ্রুত হয় এবং ট্র্যাকটি কতটা ব্যবহারযোগ্য থাকে।

