১৯৮৫ সালের ১৫ অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের একটি ভবনে টেলিভিশনে নাটক দেখছিলেন শিক্ষার্থী, কর্মচারী ও অতিথিরা। হঠাৎ ভবনের ছাদ ধসে পড়ে। প্রাণ হারান ৩৯ জন, আহত হন আরও অনেকে। ৪১ বছর পরও এটি দেশের ইতিহাসে গভীর ক্ষত হয়ে আছে।
প্রতিবছর এই দিনে বিশ্ববিদ্যালয় শোক দিবস পালন করে। স্মৃতিসৌধে ফুল দেওয়া হয়, নীরবতা পালিত হয়। এসব প্রয়োজনীয়, কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়: আমরা কি শুধু শোকেই থেমে থাকব, নাকি অবহেলা ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার উত্তরও খুঁজব? শোক প্রকাশ মানবিক দায়িত্ব; বিপর্যয়ের কারণ চিহ্নিত করা ও পুনরাবৃত্তি ঠেকানো প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব।
দুর্ঘটনা, নাকি অবহেলার পরিণতি?
বৃষ্টি বা প্রাকৃতিক পরিস্থিতির ভূমিকা থাকতে পারে। তবু দীর্ঘদিন ব্যবহৃত ভবনের রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কর্তৃপক্ষের মৌলিক দায়িত্ব। তাই জানা দরকার, ভবনটির অবস্থা নিয়ে আগে কোনো সতর্কতা ছিল কি না, মেরামতের প্রয়োজন চিহ্নিত হয়েছিল কি না, এবং হলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।
এ প্রশ্ন কাউকে আগাম দোষারোপের জন্য নয়, প্রমাণ, নথি ও নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের মাধ্যমে সত্য জানার জন্য। আবেগ যেমন যথেষ্ট নয়, সময়ের ব্যবধান দেখিয়ে প্রশ্ন এড়ানোও গ্রহণযোগ্য নয়।

স্মৃতি সংরক্ষণ আর জবাবদিহি এক নয়
স্মৃতিসৌধ ও স্মরণসভা পরবর্তী প্রজন্মকে ইতিহাস চেনায়। কিন্তু একটি প্রতিষ্ঠান অতীতকে কতটা সম্মান করে, তা বোঝা যায় ভুল থেকে শেখার আন্তরিকতায়। তাই একটি নথিভিত্তিক জনসমক্ষ বিবরণ দরকার, যাতে থাকবে:
●দুর্ঘটনার আগে ভবনের অবস্থা ও মেরামতসংক্রান্ত যোগাযোগ
●তৎকালীন সিদ্ধান্ত, তদন্তের ফলাফল ও পরবর্তী প্রশাসনিক পদক্ষেপ
●যেসব নথি পাওয়া যায়নি বা যেসব প্রশ্নের উত্তর অনিষ্পন্ন, তার স্পষ্ট উল্লেখ
শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা কি অগ্রাধিকারে সর্বোচ্চ?
বিশ্ববিদ্যালয় শুধু পাঠদান ও সনদের প্রতিষ্ঠান নয়; নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করাও তার দায়িত্ব। হলে থাকা শিক্ষার্থীর ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তা যাচাই করা ব্যক্তিগত দায়িত্ব হতে পারে না।
আমাদের দেশে উন্নয়ন বলতে প্রায়ই নতুন ভবন বোঝায়, কারণ তা দৃশ্যমান, উদ্বোধনযোগ্য। অথচ পুরোনো ভবনের নিয়মিত পরিদর্শন, ছোট মেরামত, বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা ও জরুরি নির্গমনপথ সচল রাখা তুলনামূলক উপেক্ষিত। এই ট্র্যাজেডির বড় শিক্ষা হলো, নিরাপত্তা আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি নয়, প্রতিদিনের দায়িত্ব।

চার দশক পরও কি আমরা নিরাপদ?
পুরোনো ভবন, অপর্যাপ্ত আবাসন ও রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতিকে বিচ্ছিন্ন সমস্যা ভাবা ঠিক নয়। প্রয়োজন:
●সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও আবাসিক প্রতিষ্ঠানে যোগ্য প্রকৌশলীদের নিয়ে নিয়মিত কাঠামোগত মূল্যায়ন
●ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে সংস্কার শেষ না হওয়া পর্যন্ত ব্যবহার সীমিত বা বন্ধ এবং শিক্ষার্থীদের বিকল্প নিরাপদ আবাসন
●মেরামতের বরাদ্দ, অগ্রগতি ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের তথ্য স্বচ্ছভাবে প্রকাশ
●ঝুঁকির কথা জানানোর, যাচাইয়ের ও নির্দিষ্ট সময়ে ব্যবস্থা নেওয়ার কার্যকর পদ্ধতি
শোক থেকে সংস্কার: এখন কী করণীয়
৪১ বছর পূর্তিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সামনে রয়েছে বেশ কিছু দায়িত্ব:
●দুর্ঘটনার প্রেক্ষাপট, সংরক্ষিত নথি, তদন্তের ফল ও পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ, অনুপস্থিত তথ্যের উল্লেখসহ।
●সব আবাসিক ও একাডেমিক ভবনের নিরাপত্তা মূল্যায়ন করে ঝুঁকির তালিকা, সংস্কার পরিকল্পনা ও সময়সীমা প্রকাশ।
●শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য সহজ নিরাপত্তা-অভিযোগ ব্যবস্থা এবং গৃহীত পদক্ষেপের জবাবদিহি।
●রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তা খাতের অর্থের নিয়মিত নিরীক্ষা; অবহেলার প্রমাণ মিললে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা।
●এমন নিরাপত্তা ব্যবস্থা, যেখানে ভবন ঝুঁকিপূর্ণ কি না জানতে আরেকটি প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার অপেক্ষা করতে হবে না।
নিহতদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা
৩৯টি প্রাণ কোনো পরিসংখ্যান নয়। প্রত্যেকের ছিল পরিবার, স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ। তাঁদের মৃত্যু থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি জীবনও রক্ষা পেলে, একটি ঝুঁকিপূর্ণ ভবন সময়মতো সংস্কার হলে, সেটাই স্মৃতিকে অর্থবহ করে। শোকের গভীরতা চোখের জলে নয়, দায়িত্ব পালনে মাপা যায়।
স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা থাকুক, জবাবদিহির প্রশ্নও জাগ্রত থাকুক, যাতে নিরাপত্তার অভাবে আর কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমন শোকের ইতিহাস রচিত না হয়।

