আজ ২৪ অক্টোবর, জাতিসংঘ দিবস। বিশ্বের সব স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রে প্রতিবছর এই দিনটি পালিত হয়। ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ সিদ্ধান্ত নিয়ে দিবসটির জন্য এই তারিখ ঠিক করে। কারণ ১৯৪৫ সালের এই দিনেই জাতিসংঘ সনদ কার্যকর হয়েছিল, আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছিল সংস্থাটির পথচলা।
জাতিসংঘ বিশ্বের বিভিন্ন জাতির সমন্বয়ে গঠিত একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা। বর্তমানে এর সদস্যরাষ্ট্রের সংখ্যা ১৯৩। সংস্থাটির পতাকার রং নীল ও সাদা। ‘জাতিসংঘ’ নামটি প্রথম প্রস্তাব করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরের ম্যানহাটানে এর সদর দপ্তর।
সনদের ইতিহাসে ফিরলে দেখা যায়, ১৯৪৫ সালের ২৬ জুন যুক্তরাষ্ট্রের সানফ্রান্সিসকো শহরে এটি স্বাক্ষরিত হয়। সনদে ১৯টি অধ্যায় ও ১১১টি অনুচ্ছেদ আছে। মূল সনদে সই করেছিল ৫০টি রাষ্ট্র। পরে পোল্যান্ড স্বাক্ষর করায় প্রতিষ্ঠাতা সদস্যরাষ্ট্রের সংখ্যা দাঁড়ায় ৫১। দুই বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের পর যুদ্ধ ঠেকানো এবং শান্তি ও সহযোগিতার একটি কাঠামো গড়ার তাগিদ থেকেই এই সংস্থার জন্ম। সেই অভিজ্ঞতার ছাপ সনদের প্রতিটি অধ্যায়ে স্পষ্ট।
বাংলাদেশের জন্য দিবসটির আলাদা তাৎপর্য আছে। ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর দেশটি জাতিসংঘের ১৩৬তম সদস্যরাষ্ট্র হিসেবে সদস্যপদ পায়। স্বাধীনতার পর আন্তর্জাতিক পরিসরে স্বীকৃতি পাওয়ার ক্ষেত্রে এটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এরপর শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণসহ নানা ক্ষেত্রে সংস্থাটির সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে।
কাঠামোর দিক থেকে জাতিসংঘের প্রধান অঙ্গসংস্থা ছয়টি। এগুলো হলো সাধারণ পরিষদ, নিরাপত্তা পরিষদ, অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ, সচিবালয়, অছি পরিষদ এবং আন্তর্জাতিক বিচার আদালত। এর বাইরে রয়েছে বেশ কিছু বিশেষায়িত ও উন্নয়নমূলক সংস্থা। এর মধ্যে আছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনেসকো, ইউনিসেফ, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি এবং খাদ্য ও কৃষি সংস্থা। বিশ্বব্যাংকও এই বৃহত্তর পরিবারের অংশ। এসব সংস্থা স্বাস্থ্য, শিক্ষা, শিশুকল্যাণ, দারিদ্র্য বিমোচন ও খাদ্যনিরাপত্তার মতো খাতে কাজ করে। সাধারণ মানুষের জীবনে জাতিসংঘের সবচেয়ে বাস্তব উপস্থিতি অনেক সময় এসব সংস্থার মাধ্যমেই টের পাওয়া যায়।
সবচেয়ে আলোচিত অঙ্গ নিঃসন্দেহে নিরাপত্তা পরিষদ। মোট ১৫ সদস্যের এই পরিষদে স্থায়ী সদস্য পাঁচটি। এগুলো হলো যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীন। বাকি ১০টি অস্থায়ী সদস্য। স্থায়ী সদস্যদের হাতে আছে ভেটো ক্ষমতা। অর্থাৎ এই পাঁচ দেশের যেকোনো একটি আপত্তি জানালে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবও পাস হয় না। এই ব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন আছে। সমালোচকদের মতে, বড় শক্তিগুলোর স্বার্থ জড়িয়ে থাকলে পরিষদ প্রায়ই কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। ফলে সংঘাত ও মানবিক সংকটের সময় সংস্থাটির ভূমিকা নিয়ে হতাশা তৈরি হয়। সংস্কারের দাবিও তাই বহুদিনের, যদিও এ নিয়ে এখনো বড় কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি।
জাতিসংঘের মহাসচিব সংস্থাটির প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা। বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস, যিনি পর্তুগালের নাগরিক। প্রথম মহাসচিব ছিলেন নরওয়ের ত্রিগভে লি, ১৯৪৬ থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত। সংস্থার দাপ্তরিক ভাষা ছয়টি। এগুলো ইংরেজি, ফরাসি, চীনা, রুশ, স্প্যানিশ ও আরবি। তবে সচিবালয়ের কাজকর্ম মূলত চলে ইংরেজি ও ফরাসি ভাষায়।
এই তথ্যগুলো থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়। জাতিসংঘ একদিকে বিশ্বের প্রায় সব দেশকে এক মঞ্চে আনার বিরল সুযোগ তৈরি করেছে। অন্যদিকে ক্ষমতার অসম কাঠামো থেকে সে এখনো পুরোপুরি বেরোতে পারেনি। সংস্থাটির সবচেয়ে বড় শক্তি এর বৈধতা ও সর্বজনীনতা, আর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা সদস্যরাষ্ট্রের ঐক্যের অভাব। যুদ্ধ, জলবায়ু সংকট, শরণার্থী সমস্যা কিংবা মহামারির মতো বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ একক কোনো দেশের পক্ষে সামলানো সম্ভব নয়। এ কারণেই জাতিসংঘের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সংশয় কম, প্রশ্ন বেশি এর কার্যকারিতা নিয়ে।
জাতিসংঘ দিবস তাই কেবল উদ্যাপনের দিন নয়। এটি সনদে দেওয়া অঙ্গীকারগুলো কতটা রক্ষা হয়েছে, তা মিলিয়ে দেখারও সুযোগ। শান্তি, মানবাধিকার ও উন্নয়নের যে প্রতিশ্রুতি নিয়ে সংস্থাটির যাত্রা শুরু হয়েছিল, আজকের অস্থির বিশ্বে সেগুলোর গুরুত্ব আরও বেড়েছে। বাংলাদেশসহ ছোট ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি শক্তিশালী ও বিশ্বাসযোগ্য জাতিসংঘ বিশেষভাবে জরুরি। কারণ বহুপক্ষীয় মঞ্চেই তাদের কণ্ঠস্বর সবচেয়ে বেশি শোনা যায়।

