অনলাইন প্রতারণাবিরোধী অভিযানে চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) তিন হাজারের বেশি বাংলাদেশিকে বহিষ্কার করেছে কম্বোডিয়ার অভিবাসন কর্তৃপক্ষ। একই সময়ে দেশটি মোট ৮৭টি দেশের ৫২ হাজার ৩৯ নাগরিককে আটক করে বহিষ্কার করেছে। তবে বহিষ্কৃত বাংলাদেশিদের মধ্যে কারা প্রকৃত প্রতারক আর কারা মানবপাচারের শিকার, সে বিষয়ে কোনো আলাদা পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়নি। এ নিয়ে মানবপাচারবিরোধী সংগঠনগুলো উদ্বেগ জানিয়েছে।
কম্বোডিয়াভিত্তিক গণমাধ্যম বিটিভি নিউজ গ্লোবাল গতকাল দেশটির অভিবাসন বিভাগের (জেনারেল ডিপার্টমেন্ট অব ইমিগ্রেশন) একটি প্রতিবেদনের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশটিতে ৩ হাজার ১০৪টি আইন প্রয়োগকারী অভিযান চালানো হয়েছে। এসব অভিযানেই এত বিপুলসংখ্যক বিদেশি নাগরিক আটক ও বহিষ্কৃত হন।
বহিষ্কারের সংখ্যা গত বছরের তুলনায় নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। ২০২৫ সালের একই সময়ের চেয়ে এ বছর বহিষ্কৃতের সংখ্যা ৪১ হাজার ৬৮৫ জন বেশি, যা ৪০০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি। অর্থাৎ অনলাইন প্রতারণার বিরুদ্ধে কম্বোডিয়া এ বছর অনেক বেশি কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
বহিষ্কৃতদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি চীনা নাগরিক, প্রায় ২৩ হাজার। এরপর আছেন আট হাজারের বেশি ইন্দোনেশীয় এবং চার হাজারের বেশি ভিয়েতনামি নাগরিক। চতুর্থ অবস্থানে বাংলাদেশিরা, সংখ্যা তিন হাজারের বেশি। এ ছাড়া আড়াই হাজারের বেশি পাকিস্তানি, প্রায় দুই হাজার মিয়ানমারের এবং দেড় হাজারের বেশি থাই নাগরিককে বহিষ্কার করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বহিষ্কৃতদের মধ্যে ৩৮টি দেশের ১৮ হাজারের বেশি নাগরিক সরাসরি অনলাইন প্রতারণামূলক কার্যক্রমে জড়িত ছিলেন বলে শনাক্ত হয়েছে। অর্থাৎ মোট বহিষ্কৃতের একটি অংশের বিরুদ্ধেই প্রতারণায় সরাসরি সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। বাকিদের পরিচয় ও ভূমিকা নিয়ে প্রতিবেদনে বিস্তারিত নেই।
বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর। বহিষ্কৃত বাংলাদেশিদের মধ্যে কতজন প্রতারণামূলক কাজে জড়িত ছিলেন এবং কতজন মানবপাচারের শিকার হয়ে বাধ্য হয়ে এসব কাজ করেছেন, সে বিষয়ে আলাদা কোনো পরিসংখ্যান প্রকাশ হয়নি। এই তথ্যের অভাবই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
মানবপাচারের শিকার ব্যক্তিদের উদ্ধার ও সুরক্ষায় কাজ করা অনির্বাণ সারভাইভার ভয়েস ফাউন্ডেশন বলছে, বহিষ্কৃত বাংলাদেশিদের মধ্যে কারা মানবপাচার ও জোরপূর্বক অপরাধমূলক কাজের শিকার, তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা জরুরি। সংগঠনটির মতে, যথাযথ যাচাই ছাড়া পাচারের শিকার মানুষকে অভিযুক্ত বা স্ক্যামার হিসেবে চিহ্নিত করা উচিত নয়। বরং তাঁদের ভুক্তভোগী হিসেবে শনাক্ত করে সুরক্ষা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে উদ্যোগ নিতে হবে।
সংগঠনটি আরও কিছু দাবি তুলেছে। তাদের মতে, কম্বোডিয়া থেকে বহিষ্কৃত কতজন বাংলাদেশি ইতিমধ্যে দেশে ফিরেছেন এবং কতজন এখনো সেখানে আটকে আছেন, তার সঠিক তালিকা তৈরি করতে হবে। যাঁরা এখনো কম্বোডিয়ায় আছেন, তাঁদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন। যাঁরা ফিরেছেন, তাঁদের প্রয়োজন অনুযায়ী আইনি সহায়তা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও পুনর্বাসন দিতে হবে।
পুনরায় পাচারের ঝুঁকির বিষয়েও সতর্ক করেছে সংগঠনটি। বহিষ্কৃত বাংলাদেশিরা যেন দালালচক্রের প্রলোভনে পড়ে কম্বোডিয়া থেকে অন্য কোনো দেশে অবৈধভাবে প্রবেশ না করেন এবং আবার পাচারের শিকার না হন, সে জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি বাড়ানো দরকার। একই সঙ্গে মানবপাচারকারী চক্রের সদস্যদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনারও আহ্বান জানিয়েছে তারা।
সব মিলিয়ে কম্বোডিয়ার এই অভিযান দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অনলাইন প্রতারণাচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে বাংলাদেশের জন্য মূল প্রশ্ন, বহিষ্কৃতদের মধ্যে কারা অপরাধী আর কারা পাচারের শিকার, তা আলাদা করে ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা দেওয়া এবং দালালচক্র ভেঙে দেওয়া। সেই কাজে সরকারের কার্যকর উদ্যোগের ওপরই নির্ভর করছে আরও মানুষ একই ফাঁদে পড়বে কি না।

