পোশাক খাতের অসন্তোষপ্রবণ এলাকায় অনির্দিষ্টকালের জন্য কারখানা বন্ধ রাখার আগের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছেন মালিকেরা। সরকারের উচ্চপর্যায়ের অনুরোধ ও নিরাপত্তার আশ্বাসে আজ বুধবার কারখানা খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাঁরা। তবে শ্রমিকেরা কাজে ফিরতে অনীহা দেখালে কিংবা সহিংসতা চলতে থাকলে প্রতিটি কারখানার মালিক নিজ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখতে পারবেন। এর মধ্যেই আজ প্রথমবারের মতো বৈঠকে বসছে নতুন গঠিত ন্যূনতম মজুরি বোর্ড।
গত মঙ্গলবার রাতে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর নেতাদের যৌথ বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত হয়। বৈঠকে উপস্থিত বিজিএমইএর এক নেতা জানান, শুরুতে অসন্তোষপ্রবণ এলাকার সব কারখানা একযোগে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখার বিষয়ে মালিকেরা একমত হয়েছিলেন। পরে সরকারের পরামর্শ ও নিরাপত্তার আশ্বাসে সেই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা হয়।
বিজিএমইএর সহসভাপতি মিজানুর রহমান বলেন, আজ কারখানা চালু রাখার প্রস্তাব ছিল, তাই কারখানাগুলো খোলা থাকবে। তবে অসন্তোষ চললে বা শ্রমিকেরা কাজে ফিরতে না চাইলে প্রভাবিত কারখানার মালিকেরা শ্রম আইনের ১৩(১) ধারা অনুযায়ী প্রতিষ্ঠান সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে পারবেন।
শ্রম আইনের এই ধারায় শিল্পাঞ্চলে অবৈধ ধর্মঘট বা গুরুতর অসন্তোষ দেখা দিলে মালিকপক্ষ কারখানার কাজ অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রাখতে পারে। কারখানা বন্ধ থাকার সময়ের জন্য শ্রমিকেরা মজুরি পান না। ফলে এই ধারা প্রয়োগ করা হলে লাখো শ্রমিকের আয়ে সরাসরি প্রভাব পড়বে।
শ্রমিকদের পাওনা ও বেতন পর্যালোচনায় গত রোববার ছয় সদস্যের নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করে সরকার। সেই বোর্ডের প্রথম বৈঠক আজ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। সংশ্লিষ্ট সূত্রের ধারণা, নতুন ন্যূনতম মজুরি কাঠামো নিয়ে এই বৈঠক থেকে ইতিবাচক বার্তা আসতে পারে।
বিজিএমইএর ওই নেতা আশা করছেন, বৈঠক থেকেই ইঙ্গিত মিলবে যে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে শ্রমিকদের কাঙ্ক্ষিত নতুন মজুরি ঘোষণা করা হবে। তাঁর মতে, এই ঘোষণা এলে পরিস্থিতি শান্ত হতে পারে। তিনি বলেন, এরপরও পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে মালিকেরা নিজ নিজ কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখার বিষয়ে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেবেন।
অন্যদিকে মজুরি বোর্ডে থাকা শ্রমিক প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, ডিসেম্বরের মধ্যেই যেন যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য নতুন ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা নিশ্চিত হয়, সে জন্য তাঁরা বোর্ডে জোরালো ভূমিকা রাখবেন। অর্থাৎ মালিক ও শ্রমিক, দুই পক্ষই এখন ডিসেম্বরের সময়সীমাকে সামনে রেখে এগোচ্ছে।
মজুরি বাড়ানোর দাবিতে প্রায় দুই সপ্তাহ আগে এই আন্দোলন শুরু হয়। চলতি সপ্তাহের শুরু থেকে তা মারাত্মক সহিংস রূপ নেয়। এর আগে বিজিএমইএর জ্যেষ্ঠ নেতাদের এক সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছিল, শ্রমিকদের একাংশের সহিংসতায় স্বাভাবিক উৎপাদন অসম্ভব হয়ে পড়লে অসন্তোষপ্রবণ সব কারখানা একসঙ্গে বন্ধ রাখা হবে।
মজুরি বোর্ড গঠনের পরও বিক্ষোভ থামেনি। সোমবার তা সাভার, গাজীপুর ও মিরপুরের নতুন নতুন শিল্প এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কারখানার মালিক, সরকারি কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিনিধিরা ধারাবাহিক বৈঠক করছেন। সোমবার মালিকদের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যেকোনো মূল্যে কারখানায় উৎপাদন সচল রাখার অনুরোধ জানান।
সরকার ও মালিকপক্ষের আহ্বান সত্ত্বেও গতকাল মঙ্গলবার একাধিক শিল্পাঞ্চলে অসন্তোষের তীব্রতা কমেনি। ঢাকার মিরপুর, গাজীপুর, আশুলিয়া, হেমায়েতপুর ও নারায়ণগঞ্জে শ্রমিকেরা রাস্তায় অবস্থান নেন, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ান এবং একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সড়ক অবরোধ করেন।
বিজিএমইএর সর্বশেষ হিসাবে, মিরপুর, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, আশুলিয়া ও জিরাবো এলাকার অন্তত ৩০০ কারখানায় কাজ বন্ধ রেখে ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হন কর্তৃপক্ষ। এসব কারখানার ৬ দশমিক ৯৫ লাখ শ্রমিক কাজ না করেই কর্মস্থল ছাড়েন।
মিরপুরে বিক্ষোভকারী ও পুলিশের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় চরম উত্তেজনা তৈরি হয়। সকালে মিরপুর-১০ নম্বর মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে সহিংস সংঘর্ষের কারণে নিরাপত্তার স্বার্থে সাময়িকভাবে মেট্রোরেল চলাচল স্থগিত করা হয়। সংঘর্ষের একপর্যায়ে সহকর্মীদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া এক পুলিশ কনস্টেবলকে রাস্তায় ফেলে মারধর করেন বিক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা।
আশুলিয়ায় সকাল থেকে পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। সড়কে আগুন জ্বালিয়ে অবরোধের চেষ্টা করলে পুলিশ টিয়ার গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
সাভারের হেমায়েতপুরে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক টানা দুই ঘণ্টা অবরুদ্ধ ছিল। গাজীপুরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানেও বিচ্ছিন্ন বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধের চেষ্টা হয়। বিকেলে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড প্রায় দুই ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর বিপুলসংখ্যক শ্রমিক পুলিশের সঙ্গে বড় ধরনের সংঘর্ষে জড়ান।
পরিস্থিতি আরও না বিগড়ানোর জন্য অতিরিক্ত পুলিশ, শিল্প পুলিশ ও বিজিবি মোতায়েন করে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। বাড়ানো হয়েছে নজরদারিও।
এদিকে শ্রম অসন্তোষের সুযোগে নাশকতার চেষ্টার সন্দেহে গত ২৪ ঘণ্টায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের ৩৩ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ। ডিএমপির মিডিয়া ও জনসংযোগ বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার নিয়াজ মেহেদী জানান, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা সাধারণ পোশাকশ্রমিকের ছদ্মবেশে শিল্পাঞ্চলে সহিংসতায় অংশ নিচ্ছিলেন।
মালিকেরা বলছেন, কারখানা চালু রাখা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে। সোমবার যেসব কারখানায় উৎপাদন সম্ভব হয়নি, সেগুলোর বেশির ভাগ মঙ্গলবারও বন্ধ রাখতে হয়েছে। মিজানুর রহমান জানান, তাঁর নিজের ছয়টি কারখানার মধ্যে তিনটিতেই গতকাল উৎপাদন চালানো যায়নি। তিনি বলেন, এভাবে চললে দীর্ঘ সময় কারখানা খোলা রেখে শ্রমিকদের বসিয়ে বেতন দেওয়া সম্ভব হবে না।
তাঁর ভাষ্য, সরকার কারখানা খোলা রাখার অনুরোধ করছে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও স্বাভাবিক পরিবেশ ফেরানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু মাঠপর্যায়ে উন্নতি হয়নি; বরং মঙ্গলবার পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। আর্থিক ও মানসিক চাপ কতটা তীব্র, তা বোঝাতে তিনি বলেন, এভাবে ধুঁকে ধুঁকে মরার চেয়ে একবারে শেষ হয়ে যাওয়াই ভালো।
শুরুর দিকে তুলনামূলক শান্ত থাকা নারায়ণগঞ্জেও মঙ্গলবার বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে। বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান জানান, শ্রমিকেরা রাস্তায় নেমে আসায় এলাকার অন্তত ২৫ থেকে ৩০টি বড় পোশাক কারখানা উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। এসব কারখানায় প্রায় এক লাখ শ্রমিক কাজ করেন।
খাতসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ইতিমধ্যে বাংলাদেশের সরবরাহকারীদের কাছে পরিস্থিতির হালনাগাদ তথ্য চেয়েছে। ইউরোপের একটি বড় ক্রেতাপ্রতিষ্ঠানের এক প্রতিনিধি সরাসরি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎও করেছেন।
একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, কিছু বিদেশি ক্রেতা আগের প্রতিশ্রুতি থেকে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কার্যাদেশ বাতিল বা কমিয়ে দিতে শুরু করেছে। অন্যরা জানতে চাইছে, এই অচলাবস্থা আর কত দিন চলবে।
বাংলাদেশের শীর্ষ পাঁচ ক্রেতার একটি, যারা বছরে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারের পোশাক কেনে, গত সোমবার এক রপ্তানিকারককে বার্তা পাঠিয়ে জানতে চেয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে কি না এবং সরকার কী করছে।
পোশাক খাতের উদ্যোক্তা শোভন ইসলাম জানান, কিছু আন্তর্জাতিক ক্রেতা পূর্বনির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে প্রায় ২০ শতাংশ কম পণ্যের চূড়ান্ত ক্রয়াদেশ দিচ্ছে। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, এই কার্যাদেশ অন্য দেশে চলে যেতে পারে।
ঢাকায় একটি ইউরোপীয় ফ্যাশন ব্র্যান্ডের আঞ্চলিক কার্যালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন, পরিস্থিতি বিবেচনায় তাঁর প্রতিষ্ঠান আগামী দুই মাসে বাংলাদেশে যে পরিমাণ কার্যাদেশ দেওয়ার কথা ছিল, তা কমিয়ে দেওয়া হবে।
আজকের মজুরি বোর্ডের বৈঠক ও কারখানা খোলা রাখার সিদ্ধান্ত, দুটিই এখন পরিস্থিতির গতিপথ ঠিক করবে। বৈঠকে মজুরি নিয়ে স্পষ্ট আশ্বাস মিললে অসন্তোষ কমতে পারে। না মিললে কারখানা বন্ধের পথেই হাঁটতে পারেন মালিকেরা, যার প্রভাব পড়বে শ্রমিকের আয়, রপ্তানি আয় ও বিদেশি ক্রেতাদের আস্থায়।

