টানা পাঁচ দিনের শ্রমিক বিক্ষোভ, মহাসড়ক অবরোধ ও সংঘর্ষের পর ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল। নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণার পর অধিকাংশ তৈরি পোশাক কারখানা খুলে দেওয়া হয়েছে। শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সাপ্তাহিক ছুটির দিন হলেও বেশ কিছু কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কারখানাগুলোর মানবসম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এদিন প্রায় ৮০ শতাংশ শ্রমিক কর্মস্থলে যোগ দিয়েছেন।
সকাল থেকেই সাভারের হেমায়েতপুর, উলাইল, পদ্মার মোড় এবং আশুলিয়ার নরসিংহপুর, বাইপাইল, জিরাবো ও পুকুরপাড় এলাকার বিভিন্ন পোশাক কারখানায় শ্রমিকদের প্রবেশ করতে দেখা যায়। কারখানার প্রধান ফটকে নিরাপত্তাকর্মীরা পরিচয়পত্র যাচাই করে শ্রমিকদের ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেন। এ সময় শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সতর্ক অবস্থানে থাকতে দেখা যায়।
শুক্রবার দুপুর ১টা পর্যন্ত চালু থাকা কারখানাগুলোতে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে উৎপাদন কার্যক্রম চলেছে। কোথাও নতুন করে সংঘর্ষ, ভাঙচুর কিংবা অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। কয়েক দিন ধরে চলা উত্তেজনার পর শ্রমিকদের কর্মস্থলে ফিরে আসাকে শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার ইতিবাচক লক্ষণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিভিন্ন পোশাক কারখানার মানবসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শুক্রবার ছুটির দিন হওয়ায় সব শ্রমিক কর্মস্থলে আসেননি। তবে যেসব কারখানা খোলা হয়েছে, সেগুলোতে শ্রমিক উপস্থিতি প্রায় ৮০ শতাংশ। পরিস্থিতি শান্ত থাকলে শনিবার থেকে উপস্থিতি আরও বাড়তে পারে। তাদের প্রত্যাশা, পর্যায়ক্রমে শ্রমিকদের উপস্থিতি শতভাগে পৌঁছাবে এবং উৎপাদন কার্যক্রম পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে।
সকালে ঢাকা-আরিচা এবং আব্দুল্লাহপুর-বাইপাইল মহাসড়কের পাশে অবস্থিত বেশ কয়েকটি পোশাক কারখানা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতিতে খুলে দেওয়া হয়। এ সময় শ্রমিকদের স্বতঃস্ফূর্তভাবে কর্মস্থলে প্রবেশ করতে দেখা যায়। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ দুই মহাসড়কেও যান চলাচল স্বাভাবিক ছিল।
এর আগে কয়েক দিন ধরে শ্রমিকদের বিক্ষোভ ও মহাসড়ক অবরোধের কারণে সাভার-আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চলে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়। শ্রমিকদের একটি অংশ মাসিক ৩০ হাজার টাকা বেতনের দাবিতে আন্দোলনে নামেন। আন্দোলনের একপর্যায়ে মহাসড়ক অবরোধ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া এবং সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে শিল্পাঞ্চলের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং বিভিন্ন কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়।
তবে নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণার পর পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে শুরু করেছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, মজুরি কমিশন বোর্ডের সিদ্ধান্তের পর বৃহস্পতিবার থেকেই বেশ কয়েকটি পোশাক কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম পুনরায় শুরু হয়। শুক্রবারও কিছু কারখানা চালু রাখা হয়।
একজন পোশাক কারখানার মালিক জানিয়েছেন, শ্রমিকেরা আগামী জানুয়ারিতে নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী বর্ধিত বেতন পাবেন। তার দাবি, শ্রমিক অসন্তোষকে কেন্দ্র করে একটি মহল পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করেছে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে প্রতিবেদনে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো তথ্য উল্লেখ করা হয়নি।
এদিকে শিল্পাঞ্চলে নতুন করে কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়া ঠেকাতে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করেছে প্রশাসন। পুলিশের পাশাপাশি বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ১৩ প্লাটুন সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা দায়িত্ব পালন করছেন।
প্রকাশিত প্রতিবেদনের একাংশে আটজন এবং অন্য অংশে ১০ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে উভয় ক্ষেত্রেই শিল্পাঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাড়তি উপস্থিতির বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
আশুলিয়া শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার মমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া সাম্প্রতিক সহিংসতার জন্য রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তৎপরতাকে দায়ী করেছেন। তার অভিযোগ, একটি গোষ্ঠী শ্রমিক আন্দোলনকে ব্যবহার করে পুলিশকে লক্ষ্যবস্তু বানানো এবং শিল্পাঞ্চলে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা করেছে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, অতীতেও একই ধরনের তৎপরতার মাধ্যমে পুলিশ ও সাধারণ মানুষকে মুখোমুখি দাঁড় করানোর চেষ্টা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন বলে জানান তিনি।
তবে এসব অভিযোগ পুলিশের বক্তব্য হিসেবে উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো আদালতে প্রমাণিত হয়েছে কি না, সে বিষয়ে প্রতিবেদনে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।
এদিকে গত পাঁচ দিনের আন্দোলন ও সহিংসতার ঘটনায় সাভার ও আশুলিয়া থানায় মোট সাতটি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় কয়েক হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ৩৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাইফুল আলম জানিয়েছেন, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের কেউ পোশাকশ্রমিক নন। তবে তাদের পরিচয়, সংশ্লিষ্টতা এবং অভিযোগের বিস্তারিত বিষয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে অতিরিক্ত তথ্য দেওয়া হয়নি।
ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শামিমা পারভীন শিল্পী জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ঢাকায় অনুষ্ঠিত মজুরি কমিশন বোর্ডের সভায় শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, শ্রমিকেরা আগামী জানুয়ারিতে ডিসেম্বর মাসের বেতনের সঙ্গে বর্ধিত অর্থ পাবেন।
নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণার পর শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকদের মধ্যে স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। কয়েক দিন ধরে চলা উত্তেজনার পর কারখানা খুলে দেওয়া এবং শ্রমিকদের কাজে যোগদান পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ায় সাভার ও আশুলিয়ার অনেক কারখানা বন্ধ ছিল। ফলে শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় তুলনামূলক নীরব পরিবেশ দেখা গেছে। যেসব কারখানা চালু ছিল, সেগুলোতে স্বাভাবিক উৎপাদন কার্যক্রম অব্যাহত ছিল।
শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসন সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও কারখানাসংলগ্ন এলাকায় পুলিশের টহল এবং নিরাপত্তা নজরদারি অব্যাহত রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের নিরাপদে কর্মস্থলে যাতায়াত নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কারখানার কর্মকর্তারা আশা করছেন, নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে শ্রমিকদের মধ্যে তৈরি হওয়া স্বস্তি বজায় থাকলে আগামী দিনগুলোতে উৎপাদন কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে। বিশেষ করে শনিবার থেকে অধিকাংশ কারখানায় নিয়মিত কার্যক্রম শুরু হলে শ্রমিক উপস্থিতি বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সব মিলিয়ে পাঁচ দিনের অস্থিরতার পর সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরে আসার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। শুক্রবার ছুটির দিনেও চালু থাকা কারখানাগুলোতে প্রায় ৮০ শতাংশ শ্রমিকের উপস্থিতি এবং বড় ধরনের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে শিল্পাঞ্চলে স্থায়ী শান্তি বজায় রাখা এবং উৎপাদন পুরোপুরি স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে ঘোষিত বেতন কাঠামোর বাস্তবায়ন, শ্রমিকদের আস্থা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আগামী কয়েক দিনের পরিস্থিতিই স্পষ্ট করবে, শিল্পাঞ্চল কত দ্রুত আগের স্বাভাবিক উৎপাদন কার্যক্রমে ফিরতে পারছে।

