কুষ্টিয়া শহরে যৌথ বাহিনীর অভিযানে ধরা পড়েছেন দেশের শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন। তাঁর সঙ্গে আরও এক শীর্ষ সন্ত্রাসী মোল্লা মাসুদসহ আটজনকে আটক করা হয়েছে।
আজ মঙ্গলবার দুপুর সোয়া তিনটার দিকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র।
ভোর পাঁচটা থেকে সকাল আটটা পর্যন্ত কুষ্টিয়া শহরের কালীশংকরপুর এলাকায় সোনার বাংলা মসজিদের পাশে একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে সুব্রত বাইনের অবস্থান শনাক্ত করা হয়। সেখান থেকেই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
সুব্রত বাইন নব্বইয়ের দশকে ঢাকার অপরাধ জগতের একটি পরিচিত ও ভয়ংকর নাম। সেই সময় দরপত্র নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি ও এলাকা দখলের মতো অপরাধে বারবার উঠে আসে তাঁর নাম। এসব কর্মকাণ্ড চালাতে গিয়ে সংঘটিত হয়েছে একাধিক খুন ও সহিংসতা।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সুব্রত বাইনের উত্থান ঘটে মগবাজার এলাকার ‘বিশাল সেন্টার’কে ঘিরে। সেখানে ‘চাংপাই’ নামে একটি রেস্টুরেন্টে তিনি কর্মচারী ছিলেন। ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়েন অপরাধ জগতে। পরে বিশাল সেন্টারই হয়ে ওঠে তাঁর অপরাধ কর্মকাণ্ডের ঘাঁটি। এজন্য তাঁকে অনেকেই ‘বিশালের সুব্রত’ নামে চিনতেন।
২০০১ সালের ২৫ ডিসেম্বর তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার যে ২৩ জন শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকা প্রকাশ করেছিল, তাতে সুব্রত বাইনের নাম ছিল অন্যতম। তাঁর নামে এখনো ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারি রয়েছে। রেড নোটিশে তাঁর বয়স দেখানো হয়েছে ৫৫ বছর। সেই সময় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সুব্রতকে ধরিয়ে দিতে পুরস্কার ঘোষণা করেছিল।
অভিযানের দিন সকালে, কালীশংকরপুর এলাকায় অভিযুক্ত বাড়ির সামনে গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা ও ভাড়াটিয়াদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তিন ঘণ্টা ধরে সেনাবাহিনীর সদস্যরা সেখানে অভিযান চালান।
এই এলাকায় বেশির ভাগ বাড়িতেই ছাত্রদের মেস হিসেবে ভাড়া দেওয়া হয়। যে বাড়িতে অভিযান চালানো হয়েছে, সেটির মালিকের নাম সাইনবোর্ডে লেখা ছিল-মীর মহিউদ্দিন। তিনতলা বাড়িটির দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের ১৮ জন ছাত্র ভাড়া থাকেন।
ছাত্রদের কয়েকজন জানিয়েছেন, নিচতলায় বাড়ির পেছনের একটি অংশ এক স্থানীয় ব্যক্তি দুই মাস আগে ভাড়া নেন। ১২ থেকে ১৫ দিন আগে তিনি একজনকে অতিথি পরিচয়ে সেখানে রেখে যান। সেই নিচতলায় ঠিক কী ঘটে বা কে থাকে, তা কেউই জানতেন না। তবে একজনকে দিনে এক-দুবার শুধু খাবারের সময় বের হতে দেখা যেত।
আজ ভোর পাঁচটার পর হঠাৎ বাড়ির সামনে আসে সেনাবাহিনীর পাঁচ থেকে ছয়টি গাড়ি। সঙ্গে একটি কালো রঙের মাইক্রোবাসও ছিল। ২০ থেকে ৩০ জন সেনাসদস্য বাড়ির তালা খুলতে বলেন। তালা খোলার পর তাঁরা দোতলা ও তিনতলায় ওঠেন এবং সব ছাত্রকে একটি করে কক্ষে বসতে বলেন।
একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘তোমাদের ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আমরা শুধু অভিযান চালাচ্ছি।’ ছাত্রদের ভাষ্যমতে, ওই সেনা কর্মকর্তা বেশ আন্তরিক ছিলেন। তিনি জিজ্ঞেস করেন, কোনো দাড়িওয়ালা ব্যক্তি এই মেসে থাকে কি না।
প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে নিচতলায় তল্লাশি চলে। এরপর আটটার দিকে কালো মাইক্রোবাসটি বাড়ির গেটের সামনে এসে থামে। সেখান থেকে এক দাড়িওয়ালা ব্যক্তিকে হাতকড়া পরানো ও মাথায় গামছা বাঁধা অবস্থায় গাড়িতে তোলা হয়। আরেক যুবককে কোমর ও শরীরে দড়ি দিয়ে বাঁধা অবস্থায় দেখা যায়।
এক ছাত্র কৌতূহলবশত জিজ্ঞেস করেন, কাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে? উত্তরে একজন সেনা কর্মকর্তা বলেন, ‘এখন বললে ভয় পাবে। পরে মিডিয়ায় দেখে নিও।’
এভাবেই দীর্ঘ পরিকল্পনার পর যৌথ বাহিনীর অভিযানে ধরা পড়ে যায় দীর্ঘদিন ধরে পলাতক থাকা দেশের অন্যতম কুখ্যাত সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন।

