২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করা হয়েছে। ১১ জুন অর্থমন্ত্রী প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই বাজেট উপস্থাপন করেন। প্রস্তাবিত বাজেটটি মাসের ৩০ তারিখে সংসদে আলোচনার মাধ্যমে পাস হওয়ার কথা রয়েছে।
প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে বাজেট ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য ৭ দশমিক ৫ শতাংশ।
এই বাজেটকে বর্তমান গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের প্রথম বাজেট হিসেবে দেখা হচ্ছে। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি দীর্ঘ প্রায় দুই দশক পর আবারও জাতীয় বাজেট প্রণয়ন ও উপস্থাপনার সুযোগ পেয়েছে। সর্বশেষ ২০০৬ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সময় জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপন করা হয়েছিল।
এরপর দীর্ঘ সময় রাজনৈতিক পরিবর্তন ও অস্থিরতার মধ্য দিয়ে দেশ অতিক্রম করেছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর আগের সরকারের পতন ঘটে এবং পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। এই অন্তর্বর্তী সরকার প্রায় দেড় বছর দেশ পরিচালনা করে এবং দুইটি বাজেট বাস্তবায়নের সুযোগ পায়। এর মধ্যে একটি ছিল পূর্ববর্তী সরকারের প্রণীত বাজেট, আর অন্যটি ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের নিজস্ব পরিকল্পনায় তৈরি বাজেট, যার আকার ছিল প্রায় ৭ লাখ ৯৪ হাজার কোটি টাকা, পরে সংশোধিত হয়ে দাঁড়ায় ৭ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা।
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বলা হচ্ছে, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান লক্ষ্য ছিল বিচার, রাষ্ট্রীয় সংস্কার এবং গণতান্ত্রিক উত্তরণ নিশ্চিত করা। এই তিন লক্ষ্য বাস্তবায়নের প্রেক্ষিতে তাদের ভূমিকা আলোচনা করা হয় বাজেট বিশ্লেষণে।
পরবর্তী সময়ে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। অভিযোগ হিসেবে বলা হয়, আগের সরকারের সময় দেশের বিভিন্ন খাতে ব্যাপক দুর্নীতি, লুটপাট এবং আর্থিক অব্যবস্থাপনা তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে পুঁজিবাজার, ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক খাতে সংকট সৃষ্টি হয়। খেলাপি ঋণের বোঝা এবং আস্থাহীনতার কারণে পুরো আর্থিক খাত চাপের মধ্যে পড়ে। এই প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেশি। বিশেষ করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য হ্রাস এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি’ ধারণা সামনে এনেছেন বলে উল্লেখ করা হয়। এই অর্থনৈতিক ভিশনের লক্ষ্য হলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য কমানো এবং বাংলাদেশকে একটি মর্যাদাশীল অর্থনীতিতে রূপান্তর করা। প্রস্তাবিত বাজেটকে এই ভিশনের প্রথম বাস্তব পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশে সাধারণত বাজেটের আকার আগের বছরের তুলনায় ৮ থেকে ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। তবে এবার বাজেটের আকার প্রায় ১৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। দীর্ঘ দুই বছরের অর্থনৈতিক স্থবিরতা কাটিয়ে অর্থনীতিকে পুনরায় গতিশীল করার লক্ষ্যেই এই বড় বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়।
রাজস্ব ঘাটতির বিষয়ে বলা হয়েছে, ঘাটতির পরিমাণ মোট বাজেটের প্রায় ৭৩ শতাংশ। তবে জিডিপির তুলনায় এই ঘাটতি প্রায় ৩ দশমিক ৬ শতাংশ, যা অর্থনৈতিক মানদণ্ডে অস্বাভাবিক নয় বলে বিবেচিত হয়।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে অনেক উন্নত ও প্রতিবেশী দেশে বাজেট সাধারণত মোট দেশজ উৎপাদনের ২০ থেকে ২৫ শতাংশের সমান হয়ে থাকে। সেখানে কর-জিডিপি অনুপাত প্রায় ১৫ শতাংশের কাছাকাছি। কিন্তু বাংলাদেশে এই অনুপাত মাত্র ৬ দশমিক ৮ শতাংশ, যা তুলনামূলকভাবে অনেক কম।
এই পরিস্থিতিতে কর আদায় ব্যবস্থা শক্তিশালী করা গেলে ভবিষ্যতে আরও বড় বাজেট প্রণয়ন এবং ঘাটতি কমানো সম্ভব হবে বলে বিশ্লেষণে মত দেওয়া হয়।
প্রস্তাবিত বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখা এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা চালু এবং নবম জাতীয় বেতন স্কেল বাস্তবায়নের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে বাজেট বাস্তবায়নে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে ব্যাংক খাত থেকে ঋণ গ্রহণ। প্রায় ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ব্যাংক থেকে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কম থাকায় এই চাপ ব্যবসা খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
নতুন বাজেট বাস্তবায়নের মূল চ্যালেঞ্জ হবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কার্যকর কর আদায় এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে কর ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা তৈরি করা জরুরি বলে মনে করা হচ্ছে।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, কর ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে জনগণ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে কর দিতে আগ্রহী হবে। এতে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো সম্ভব হবে এবং দেশের উন্নয়ন কার্যক্রম আরও শক্তিশালী হবে।
সব মিলিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে অর্থনৈতিক রূপান্তরের একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়ন, আর্থিক শৃঙ্খলা এবং রাজস্ব ব্যবস্থার কার্যকারিতার ওপর।
- ড. শহীদুল জাহীদ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক এবং চেয়ারম্যান

