চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে না। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ১৩টি প্রধান কারণে এই প্রকল্পগুলো ব্যর্থতার মুখ দেখছে। এর ফলে বর্ষায় নগরবাসীকে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
নিচে এই কারণগুলো তুলে ধরা হলো:
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রকল্পগুলোর শুরুতেই ত্রুটি ছিল। যেকোনো মেগা প্রকল্পের জন্য অত্যাবশ্যকীয় সম্ভাব্যতা সমীক্ষা (ফিজিবিলিটি স্টাডি) না করে কাজ শুরু করা হয়েছে। এছাড়া খালের সীমানা নির্ধারণ ছাড়াই উন্নয়ন কাজ শুরু হওয়ায় কংক্রিটের দেয়াল নির্মাণের ফলে খালগুলো সংকুচিত হয়েছে- যা পানি ধারণ ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে।
খালের সংখ্যা ক্রমাগত কমে যাওয়াও একটি বড় সমস্যা। ১৯৯৫ সালে চট্টগ্রামে ৭২টি খাল থাকলেও ২০১৬ সালে তা কমে ৫৭টি এবং ২০২৩ সালে মাত্র ৩৬টি খালের মাধ্যমে পানি নিষ্কাশন হচ্ছে। এছাড়া স্থানীয়দের মতামত ও স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা না করেই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় প্রাথমিকভাবে কিছু প্রাইমারি খাল সংস্কার করা হলেও অর্ধেক খাল এই প্রকল্পের বাইরে রয়ে গেছে। সেকেন্ডারি ও টারশিয়ারি খালগুলোর কোনো সংস্কার হয়নি। এদিকে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) উন্মুক্ত জলাধার ভরাট করে অপরিকল্পিতভাবে আবাসিক এলাকা গড়ে তুলছে- যা জলাবদ্ধতাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
প্রকল্পের অপরিকল্পিত কাজ, যেমন খালের কংক্রিট দেয়াল ও পাশের ভূমির উচ্চতা বেশি হওয়ায় পানির স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। এছাড়া পুরোনো ব্রিজ, রেললাইন ও কালভার্টের নিচে ইউটিলিটি পাইপগুলো পানি প্রবাহে বাধা দিচ্ছে।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ঘাটতি জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ। গৃহস্থালি বর্জ্য, পলিথিন, পচনশীল-অপচনশীল বর্জ্য এবং শিল্প-বাজারের বর্জ্য সরাসরি খালে ফেলা হচ্ছে। এছাড়া সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অসংখ্য স্থাপনা ও প্রভাবশালীদের দ্বারা খালের জায়গা দখল জলাবদ্ধতাকে তীব্র করছে।
পাহাড়ি এলাকার মাটি কাটার ফলে খালের তলদেশ ভরাট হয়ে নাব্যতা হ্রাস পাচ্ছে। প্রকল্পের পরিকল্পনায় পাহাড়ি এলাকার বিষয়টি যাচাই করা হয়নি। এছাড়া প্রকল্পের কাজের ধীরগতি, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রশিক্ষিত জনশক্তির অভাব এবং প্রযুক্তিগত দুর্বলতা সমস্যাকে আরও জটিল করছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো আন্তবিভাগীয় সমন্বয়হীনতা। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, চট্টগ্রাম ওয়াসা, পানি উন্নয়ন বোর্ড, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং সড়ক ও জনপদ বিভাগের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব প্রকল্পের সাফল্যকে বাধাগ্রস্ত করছে।
এই সব কারণে চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প কার্যকর ফলাফল দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। নগরবাসীর ভোগান্তি কমাতে সমন্বিত উদ্যোগ, সঠিক পরিকল্পনা এবং দ্রুত বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তা এখন জরুরি।

