দরিদ্র ও অসচ্ছল মানুষের জন্য সরকারি আইনি সহায়তা কার্যক্রম আরও কার্যকর করতে বড় ধরনের সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। তবে কম পারিশ্রমিকের কারণে অনেক দক্ষ আইনজীবী তৃণমূল পর্যায়ের এই সেবায় যুক্ত হতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না বলে জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্যানেল আইনজীবীদের ফি আরও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
রোববার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত দরিদ্র, অসচ্ছল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য আইনি সহায়তা সহজলভ্য করতে সরকার বিদ্যমান জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থাকে আরও শক্তিশালী কাঠামোয় রূপান্তর করেছে। সাম্প্রতিক আইনি সংশোধনের মাধ্যমে এটিকে আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরে উন্নীত করা হয়েছে, যা দেশের বিচারপ্রাপ্তি ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তিনি বলেন, এই রূপান্তরের ফলে রাজধানীর বাইরে বিভিন্ন জেলায় এবং ধাপে ধাপে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত সরকারি আইনি সহায়তা সেবা বিস্তারের সুযোগ তৈরি হয়েছে। ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত আইনি সেবা পৌঁছে দিতে নতুন কাঠামো আইনি ভিত্তি জোরদার করেছে। পাশাপাশি জনবল বৃদ্ধি ও প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়ানোর কাজও চলছে।
মন্ত্রী জানান, সরকারি লিগ্যাল এইড কার্যক্রমের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো দক্ষ ও অভিজ্ঞ আইনজীবীদের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা। বর্তমান ফি কাঠামো অনেক ক্ষেত্রে আইনজীবীদের জন্য পর্যাপ্ত নয়। ফলে অনেক যোগ্য আইনজীবী এই সেবার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে যুক্ত হতে আগ্রহ হারান। এছাড়া মামলা দায়ের, আদালত ফি, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ এবং অন্যান্য প্রাথমিক ব্যয়ের জন্য আলাদা সরকারি সহায়তা না থাকায় আইনজীবীদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ পড়ে।
এই বাস্তবতা বিবেচনায় সরকার ইতোমধ্যে প্যানেল আইনজীবীদের পারিশ্রমিক ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি করেছে বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে বর্তমান ব্যয় ও বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ফি আরও বাড়ানোর বিষয়েও কাজ চলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি আইনি সহায়তা কার্যক্রমে দক্ষ আইনজীবীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো না গেলে বিচারপ্রার্থী মানুষের কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত করা কঠিন হবে। কারণ অধিকাংশ সুবিধাভোগীই অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল এবং তাদের পক্ষে বেসরকারিভাবে আইনজীবী নিয়োগ করা সম্ভব হয় না।
আইনমন্ত্রী আরও বলেন, শুধু কাঠামোগত পরিবর্তন নয়, সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোও সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। অনেক মানুষ এখনও জানেন না যে সরকারি খরচে বা বিনামূল্যে আইনি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। এই সীমাবদ্ধতা দূর করতে মাঠপর্যায়ে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
তিনি জানান, সরকার ও জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির যৌথ উদ্যোগে ডিজিটাল লিগ্যাল এইড কার্যক্রম সম্প্রসারণের কাজ চলছে। এর আওতায় কয়েকশ ইউনিয়নে ডিজিটাল সেবা কেন্দ্র স্থাপন, অনলাইন পোর্টাল চালু, মোবাইল অ্যাপ উন্নয়ন এবং টোল-ফ্রি হেল্পলাইনকে আরও কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গ্রামাঞ্চলের মানুষের কাছে আইনি সহায়তার তথ্য পৌঁছে দিতে উঠান বৈঠক, গণশুনানি, সেমিনার, পথনাটক, লিফলেট বিতরণ এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি। প্রতিবছর জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস পালনের মাধ্যমে জনগণকে এ বিষয়ে আরও অবহিত করার চেষ্টা চলছে।
সরকারি লিগ্যাল এইড সেবার সঙ্গে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর সমন্বয় নিয়েও কথা বলেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তথ্য ব্যবস্থাপনা, জবাবদিহিতা এবং কার্যপদ্ধতির মধ্যে পার্থক্য থাকায় ডিজিটাল সমন্বয় এখনো পুরোপুরি সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে তথ্য সুরক্ষা, ডেটা শেয়ারিং নীতিমালার অভাব এবং পৃথক কেস ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থা এই প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলেছে।
তবে এসব বাধা দূর করে একটি সমন্বিত ডিজিটাল আইনি সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে। এজন্য প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়ন, প্রযুক্তিগত অবকাঠামো উন্নয়ন, তথ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীজনদের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সংসদে দেওয়া মন্ত্রীর বক্তব্য থেকে স্পষ্ট হয়েছে, শুধু আইনগত সহায়তার পরিধি বাড়ানো নয়, বরং তৃণমূলের মানুষের কাছে কার্যকর ও মানসম্মত আইনি সেবা পৌঁছে দিতে সরকার প্রশাসনিক, প্রযুক্তিগত এবং আর্থিক—তিন ক্ষেত্রেই সংস্কারের পথে এগোচ্ছে। তবে এই উদ্যোগের সফলতা অনেকাংশে নির্ভর করবে দক্ষ আইনজীবীদের অংশগ্রহণ, পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং মাঠপর্যায়ে সেবার কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর।

