বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই মুহূর্তে সবচেয়ে আলোচিত একটি শব্দ—‘জুলাই সনদ’। অনেকে এটিকে একটি সম্ভাব্য যুগান্তকারী দলিল হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ কেউ বলছেন, এটি কেবল আরেকটি রাজনৈতিক চাল। তাহলে আসলে কী এই জুলাই সনদ? কেন এত বিতর্ক? আর এটি কি সত্যিই দেশের রাজনৈতিক সংস্কারে কোনো বড় পরিবর্তন আনতে পারবে?
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে ঘটে যায় এক বিশাল গণঅভ্যুত্থান। নেতৃত্বে ছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। এর পরেই অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয় এবং রাষ্ট্র ব্যবস্থার সংস্কারে ১১টি কমিশন গঠন করে।
এই কমিশনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন, যাদের কাজ ছিল বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে একটি সর্বজনীন সংস্কার প্রস্তাবনা তৈরি করা। এ থেকেই জন্ম নেয় ‘জুলাই সনদ’—একটি দলিল, যা হতে পারে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের রাজনৈতিক কাঠামোর ভিত্তিপ্রস্তর।
তাহলে জুলাই সনদ আসলে কী?
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনুসের ভাষায়, “জুলাই সনদ হলো একটি প্রতিশ্রুতি। একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্র নির্মাণের জন্য সংস্কার কমিশন যেসব প্রস্তাব দিয়েছে, তার মধ্যে যেগুলোর ওপর রাজনৈতিক দলগুলো একমত হয়েছে, সেগুলোর তালিকাই থাকবে এই সনদে।”
সংক্ষেপে বললে, এটি একটি সমঝোতার দলিল—যেখানে থাকবে রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মতিতে গৃহীত সংস্কার প্রস্তাবের তালিকা।
এখন পর্যন্ত কী কী বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে?
ঐকমত্য কমিশনের টানা কয়েক মাসের আলোচনায় অংশ নেয় বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি সহ প্রায় ৩০টি রাজনৈতিক দল। মোট ১৬৬টি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে এখন পর্যন্ত অন্তত ৮০টির ওপর ঐকমত্যে পৌঁছেছে তারা।
বিশেষভাবে পাঁচটি বিষয়ে সব দল একমত হয়েছে:
- সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে সংশোধন
- সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোর সভাপতিত্ব নির্ধারণে স্বচ্ছতা
- নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ
- রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদানের বিধানে পরিবর্তন
- হাইকোর্টকে বিকেন্দ্রীকরণ
তবে গুরুত্বপূর্ণ আরও কিছু প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা এখনো চলছে। যেমন—প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা সীমিত করা, দলীয় প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী আলাদা ব্যক্তি হওয়া, এনসিসি বা জাতীয় সাংবিধানিক পরিষদ গঠন করে নিয়োগ প্রক্রিয়া নিরপেক্ষ করা ইত্যাদি।

জুলাই সনদ আর জুলাই ঘোষণাপত্র—এই দুই কি আলাদা?
হ্যাঁ, এটিই এখন অনেকের বড় প্রশ্ন। অনেকেই ধরে নিচ্ছেন দুটো একই বিষয়, কিন্তু বাস্তবে তা নয়।
ঐকমত্য কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ‘জুলাই সনদ’ হচ্ছে সেই প্রস্তাবনা যেখানে সব রাজনৈতিক দল একমত হয়েছে। এটি কমিশনের তৈরি করা দলিল।
অন্যদিকে ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ হবে রাজনৈতিক দল ও সরকারের সম্মিলিতভাবে তৈরি একটি ইশতেহার, যা তৃতীয় অগাস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ছাত্র-জনতার উপস্থিতিতে প্রকাশের প্রস্তুতি চলছে। এটি মূলত রাজনৈতিক অঙ্গীকারের প্রকাশ হবে, যা ঐকমত্য সনদের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত হতে পারে।
কেন এত বিতর্ক?
যদিও কিছু কিছু বিষয়ে একমত হওয়া গেছে, কিন্তু অনেক মৌলিক সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে এখনো মতভেদ রয়ে গেছে। যেমন—প্রোপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন (PR) বা আনুপাতিক ভোট ব্যবস্থা, এনসিসি’র গঠন ও ক্ষমতা, বিচার বিভাগীয় নিয়োগ, দুর্নীতি দমন কমিশনের স্বাধীনতা ইত্যাদি। বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলো চাইছে তাদের নিজ নিজ স্বার্থরক্ষার সুযোগ সনদে থাকুক। আর এখানেই তৈরি হচ্ছে সংকট।
বিএনপির নেতা সালাহউদ্দিন আহমদের মতে, “সব বিষয়ে যদি শতভাগ একমত হতে হয়, তবে আলোচনার প্রয়োজনটাই বা কী?”
এর জবাবে অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলছেন, “এমন নয় যে আলোচনা বন্ধ হয়ে গেছে। আমরা এখনো আশাবাদী যে ঐকমত্য সম্ভব।”
নাম থাকবে কি ‘জুলাই সনদ’?
চূড়ান্ত সংস্কার দলিলটি আদৌ ‘জুলাই সনদ’ নামে প্রকাশিত হবে কিনা—সেটি এখনো নিশ্চিত নয়। ঐকমত্য কমিশনের পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, এটি শেষ পর্যন্ত ‘জাতীয় সনদ’ নামেও প্রকাশ পেতে পারে। তবে ‘জুলাই সনদ’ নামটি এক ধরনের প্রতীক—২০২৪ সালের জুলাই মাসে ঘটে যাওয়া গণআন্দোলনের স্মারক হিসেবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি কেবল একটি কাগজ নয়—বরং এটি হতে পারে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের দালিলিক ভিত্তি। মহিউদ্দিন আহমদের ভাষায়, “জুলাই আমাদের যে বার্তা দিল, সেটার একটা দলিল থাকা দরকার। সে জন্য জুলাই সনদ থাকা জরুরি।”
জুলাই সনদ নিয়ে আশাবাদ যেমন আছে, তেমনি আছে সংশয় ও মতবিরোধ। তবে এটুকু নিশ্চিত যে, বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে উঠতে পারে—যদি সত্যিকার অর্থে এটি একটি বাস্তবমুখী, গ্রহণযোগ্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক দলিল হয়।
অন্যথায়, এটি হয়তো কেবল আরেকটি ‘প্রতিশ্রুতির কাগজ’ হিসেবেই ইতিহাসে জায়গা পাবে।

