ঢাকা এখন আর শুধু জনবহুল শহর নয়, এটি হয়ে উঠেছে এক গভীর সংকটের নাম। দিনকে দিন শহরটি যেন মানুষের নয় বরং ইট, কংক্রিট আর ধোঁয়ার দখলে চলে যাচ্ছে। জনসংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি কমছে সবুজ আর জলাধার। গাছপালা, খাল-বিল, পুকুর—সব যেন অতীতের গল্প হয়ে যাচ্ছে। এক সময় যে ঢাকা ছিল প্রাণচঞ্চল, এখন তা পরিণত হয়েছে জীবনের জন্য হুমকিস্বরূপ এক যন্ত্রণাময় নগরীতে।
সম্প্রতি চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ নামের একটি সংস্থা রাজধানী ঢাকার গত ৪৪ বছরের পরিবেশগত রূপান্তর বিশ্লেষণ করে ভয়াবহ এক চিত্র সামনে এনেছে। ১৯৮০ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত স্যাটেলাইট চিত্র ও নগর তাপমাত্রার উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে—এই শহরে ঘনবসতি বেড়েছে প্রায় সাত গুণ, ভূমির তাপমাত্রা বেড়েছে ৩ থেকে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, আর হারিয়ে গেছে ৬০ শতাংশ জলাধার। সবুজ ঢাকার ছায়া আজ আছে মাত্র ১১.৬ শতাংশ এলাকায়, যেখানে ৪৪ বছর আগে তা ছিল ২১.৬ শতাংশ।
গবেষণাটির শিরোনামই যেন এক চরম সতর্কবার্তা: “প্রকৃতিবিহীন ঢাকা? প্রাকৃতিক অধিকারভিত্তিক টেকসই নগর ভাবনার পুনর্বিচার”। এই গবেষণার মূল বার্তা হলো—ঢাকার বর্তমান চেহারা শুধু নগর পরিকল্পনার ব্যর্থতা নয় বরং এটি পরিবেশগত অবিচার ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা।
শুধু পরিসংখ্যানই নয়, বাস্তব পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। ঢাকার আদাবর, ওয়ারী, রামপুরা, কাফরুল—এই এলাকাগুলোতে গাছ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। মিরপুর, সূত্রাপুর, গেণ্ডারিয়া এলাকায় নেই জলাধার। আর গরমের হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে শ্যামপুর, হাজারীবাগ, তেজগাঁও, রামপুরা ও দারুসসালাম এলাকা। জীবনধারণের জন্য ন্যূনতম পরিবেশ এখানে যেন বিলাসিতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের প্রধান নির্বাহী এম জাকির হোসাইন খান বলেন, “২০৩৫ সালের মধ্যে ঢাকায় ২ কোটি ৫০ লাখ মানুষের বসবাস হবে। কিন্তু উন্নয়নের নামে এই শহরের প্রকৃতিকে যেভাবে ধ্বংস করা হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে আত্মঘাতী।” তিনি আরও জানান, দিল্লি ও জাকার্তাকেও ঢাকার চেয়ে দূষণের দিক থেকে পিছনে ফেলেছে এই নগরী। শুধু করাচি এখনো ঢাকার নিচে।
তাঁর মতে, ঢাকাকে টিকিয়ে রাখতে চাইলে সিঙ্গাপুরের মতো প্রকৃতিভিত্তিক উন্নয়ন মডেল অনুসরণ করতে হবে। প্রাকৃতিক অধিকারকে আইনি স্বীকৃতি দিতে হবে, পরিবেশকে রাখতে হবে নগর পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, যদি প্রতিটি নাগরিকের জন্য ৯ বর্গমিটার গাছপালা ও ৪.৫ বর্গমিটার জলাধার সংরক্ষণ করা যায়, তবে শহরের তাপমাত্রা গড়ে ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব। অথচ বাস্তবতা হলো, ঢাকার ৫০টি থানার মধ্যে ৩৭টি থানাই ইতিমধ্যে নিরাপদ নির্মাণসীমা অতিক্রম করে ফেলেছে। রাজধানীর কেন্দ্রে থাকা এলাকাগুলো এখন পুরোপুরি প্রকৃতিবিচ্ছিন্ন।
গবেষণায় যুক্ত পরিবেশকর্মী সাবরিন সুলতানা বলেন, “এটি শুধু জলবায়ু বা বায়ুদূষণের প্রশ্ন নয়। এটি জীবনের মৌলিক অধিকার এবং প্রাকৃতিক ন্যায্যতার বিষয়। প্রকৃতি বাঁচলে তবেই মানুষ বাঁচবে। তাই এবার সময় এসেছে শহরের নয়, প্রকৃতির অধিকারকে প্রাধান্য দেওয়ার।”
ঢাকা এখন আর শুধু উন্নয়নের সংকটে ভোগা শহর নয়, এটি এক গভীর অস্তিত্ব সংকটে নিমজ্জিত নগরী। এখান থেকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে শুধু উন্নয়ন নয়, প্রয়োজন প্রকৃতির সঙ্গে নতুন করে সংলাপ শুরু করার। কেননা প্রকৃতি যদি না বাঁচে, তাহলে ঢাকা নামক এই শহর একদিন মানুষের বসবাসের জায়গা নয় বরং ইতিহাসের একটি ব্যর্থতা হিসেবেই পরিচিত হবে।

