ঢাকার পিলখানায় ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি সংঘটিত সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিডিআরের (বর্তমানে বিজিবি) হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নিয়ে গঠিত জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন সম্প্রতি তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। কমিশনটি ১১ মাস ধরে তদন্ত চালিয়ে এই বর্বর হত্যাযজ্ঞের প্রকৃত কারণ ও জড়িতদের খুঁজে বের করেছে।
কমিশনের সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) আ ল ম ফজলুর রহমান সংবাদ সম্মেলনে জানান, হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়েছিল সেনাবাহিনীকে দুর্বল করা এবং ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য। তদন্তে প্রমাণ পাওয়া গেছে, তৎকালীন সংসদ সদস্য শেখ ফজলে নূর তাপস ছিলেন পুরো হত্যাযজ্ঞের মূল সমন্বয়কারী। এছাড়া কমিশন বলেছে, হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘গ্রিন সিগন্যাল’ ছিল।
কমিশন প্রকাশ করেছে, কিছু বিদেশি শক্তি, বিশেষ করে ভারত, এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিল এবং বাংলাদেশের অস্থিতিশীলতা থেকে সুবিধা নিয়েছিল। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, হত্যাকাণ্ডের সময় ৯২১ ভারতীয় বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিল, যার মধ্যে ৬৭ জনের অবস্থান এখনও অনিশ্চিত।
সংবাদ সম্মেলনে ফজলুর রহমান বলেন, “আমরা দেখেছি, হত্যাকাণ্ড দীর্ঘ সময় ধরে পরিকল্পিত ছিল। মিটিং, ট্রেনিং গ্রাউন্ড এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের সমন্বয়ে এই ষড়যন্ত্র তৈরি হয়েছিল।” তিনি আরও জানান, পিলখানায় ঢুকানো মিছিল ও স্থানীয় রাজনৈতিক দলগুলো হত্যাকাণ্ডের সমর্থনে সরাসরি ভূমিকা নিয়েছিল।
কমিশন প্রতিবেদনে নাম এসেছে অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তির, যার মধ্যে রয়েছে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক সংসদ সদস্য শেখ ফজলে নূর তাপস, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, মির্জা আজম, জাহাঙ্গীর কবির নানক এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন। এছাড়াও সামরিক কর্মকর্তাদেরও নাম ধরা হয়েছে, যেমন সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদ ও ডিজিএফআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক লে. জেনারেল (অব.) মোল্লা ফজলে আকবর।

কমিশনের প্রধান জানান, হত্যাকাণ্ডের সময় বহু আলামত ধ্বংস হয়ে গেছে এবং অনেক সন্দেহভাজন ব্যক্তি বিদেশে চলে গিয়েছেন। তবুও সাক্ষী ও প্রমাণ সংগ্রহের মাধ্যমে তারা যথাসম্ভব তথ্য উদঘাটন করেছেন। তদন্তে দেখা গেছে, তৎকালীন সেনাপ্রধানের সরাসরি পদক্ষেপ না নেওয়ায় হত্যাকাণ্ডের ঘটনা আরও ত্বরান্বিত হয়েছে।
কমিশন তাদের প্রতিবেদনে বেশ কিছু সুপারিশও করেছে। এগুলো মূলত ভবিষ্যতে সেনা ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীতে এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা এবং ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, “জাতি দীর্ঘদিন এই হত্যাকাণ্ডের সত্য জানার অপেক্ষায় ছিল। এই প্রতিবেদনের মাধ্যমে অনেক প্রশ্নের উত্তর মিলবে এবং ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষণীয় অনেক তথ্য রয়েছে।”
কমিশনের সদস্যরা:
-
মেজর জেনারেল (অব.) আ ল ম ফজলুর রহমান (সভাপতি)
-
মেজর জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর কবির তালুকদার
-
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. সাইদুর রহমান
-
অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব মুন্সী আলাউদ্দিন আল আজাদ
-
অবসরপ্রাপ্ত ডিআইজি এম আকবর আলী
-
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. শরীফুল ইসলাম
-
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক মো. শাহনেওয়াজ খান চন্দন
তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের মাধ্যমে পিলখানার হত্যাকাণ্ডের ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায় আংশিকভাবে উন্মোচিত হলো। কমিশন আশাপ্রকাশ করেছে, ভবিষ্যতে এই ধরনের ঘটনা রোধে প্রশাসন ও বাহিনী সংস্কারে তাদের সুপারিশ কার্যকর হবে।

