নড়াইলের কালিয়া উপজেলার পেড়লি ইউনিয়নে অবস্থিত মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রটি দেখতে চোখজুড়ানো, ব্যয়বহুল আধুনিক ভবন নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেও ভেতরে গিয়ে যা মিলছে, তা কেবল হতাশা। রোগী আসছেন, কিন্তু চিকিৎসক নেই। ফলে দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষদের বেশিরভাগই সেবা না পেয়ে খালি হাতে ফিরে যাচ্ছেন।
বুধবার সকালে এই হাসপাতালে এসেছিলেন জামরেলডাঙা গ্রামের এক বৃদ্ধা, সঙ্গে তার নয় মাস ধরে অসুস্থ মেয়ে ও পাঁচ বছরের নাতি। কিন্তু হাসপাতালের মূল ফটকে গিয়ে তিনি দেখেন সেখানে তালা ঝুলছে। কষ্ট করে বারবার এসেও কোনো চিকিৎসক না পাওয়ার অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, হাসপাতালটি নিয়মিত খোলা থাকলে তাদের মতো দরিদ্র পরিবারের জন্য অনেকটা স্বস্তি আসত, কারণ দূরের শহরে গিয়ে চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য তাদের নেই।
শুধু এই পরিবার একা নয়, প্রতিদিনই এমন অনেক সেবাপ্রত্যাশীকে চিকিৎসা না পেয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে। সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, হাসপাতালের প্রধান ফটকের ছোট দরজা খোলা থাকলেও ভেতরের মূল দরজায় তালাবদ্ধ অবস্থা। দরজায় সাঁটানো নোটিশে লেখা আছে, এটি একটি সরকারি হাসপাতাল, যেখানে বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হয়, বিশেষত গর্ভবতী মা ও শিশুদের জন্য, এবং নির্দিষ্ট দিন ও সময়ে সেবা মেলার কথা উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, একে একে নারী ও শিশু নিয়ে অনেকে এলেও চিকিৎসকের কক্ষে তালা মারা, ওষুধ বা কর্মচারীর কোনো অস্তিত্বই নেই।
নোটিশ বোর্ডে থাকা নম্বরে যোগাযোগ করে জানা যায়, এই কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা একজন ফার্মাসিস্ট মূলত সপ্তাহে মাত্র দুই দিন এখানে রোগী দেখেন, কারণ তিনি একই সঙ্গে আরও কয়েকটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দায়িত্বও সামলাচ্ছেন। ওই দিন তিনি অন্য একটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দায়িত্বে থাকায় এই কেন্দ্রে সেবা বন্ধ ছিল।
পাশের কদমতলা গ্রাম থেকে আসা এক নারী জানান, এখানে এসে প্রায় সময়ই তারা চিকিৎসকের কক্ষ বন্ধ পান—না আছেন ডাক্তার, না আছেন কোনো কর্মচারী। তিনি সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন, হাসপাতালে চিকিৎসক থাকুক, যাতে সাধারণ মানুষ সেবা পেতে পারেন।
কেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, খড়রিয়া বাজারের পাশে পঞ্চাশ শতক জমির ওপর নির্মিত এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি ২০২০ সালে উদ্বোধন করা হয়েছিল, যার নির্মাণ ব্যয় ছিল প্রায় চার কোটি বাষট্টি লাখ টাকা। এখানে তিনতলা দুটি ভবন রয়েছে—একটি হাসপাতাল ভবন, আরেকটি চিকিৎসক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসনের জন্য। ভবনগুলোতে দশ শয্যার দুটি ওয়ার্ড, দশটি কেবিন এবং একটি আধুনিক অস্ত্রোপচার কক্ষও রয়েছে।
কিন্তু অবকাঠামো থাকলেও জনবল সেখানে নেই বলা যায়। জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এই কেন্দ্রের জন্য নির্ধারিত দশটি পদের মধ্যে রয়েছে দুজন চিকিৎসা কর্মকর্তা, একজন মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট, একজন ফার্মাসিস্ট, চারজন পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা এবং দুজন অফিস সহকারী-সহায়ক পদ। কিন্তু চালুর পর থেকে এসব পদের অধিকাংশই খালি পড়ে আছে। কেবল একজন ফার্মাসিস্ট নিয়োগপ্রাপ্ত থাকলেও তাকে উপজেলার অন্য কেন্দ্রগুলোতেও দায়িত্ব পালন করতে হয়, ফলে তিনি সপ্তাহে দুই দিনের বেশি সময় দিতে পারেন না।
পরিচ্ছন্নতাকর্মী, আয়া বা গেটম্যানের মতো সহায়ক পদেও কেউ নেই। ওই ফার্মাসিস্ট নিজেই বলেন, তিনি একসঙ্গে আরও তিনটি জায়গায় দায়িত্বে থাকায় সপ্তাহে মাত্র দুই দিন এই কেন্দ্রে আসতে পারেন। তার ভাষায়, সেবাগ্রহীতার সংখ্যা অনেক বেশি হলেও সেবাদাতা এতই কম যে হাসপাতালটি নিয়মিত খোলা রাখা সম্ভব হচ্ছে না। তিনিও স্বাস্থ্য বিভাগে জনবল নিয়োগের দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয়দের মতে, স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি সঠিকভাবে পরিচালিত হলে আশপাশের তিনটি ইউনিয়নের প্রায় চল্লিশ হাজার মানুষ এর সুফল পেতেন। কিন্তু কোটি টাকার অবকাঠামো নির্মাণের পাঁচ বছর পার হলেও জনবল সংকটে সেই প্রত্যাশিত সেবা মিলছে না। এলাকার এক যুবক জানান, হাসপাতাল চালুর প্রথম দিকে চিকিৎসক আসতেন, কিন্তু বর্তমানে তা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে এবং রোগীরা এসে খালি হাতে ফিরে যাচ্ছেন। তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন এই সমস্যা সমাধানে।
এ বিষয়ে জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের একজন উপপরিচালক স্বীকার করেছেন, নড়াইল জেলায় ব্যাপক জনবল সংকট রয়েছে—অনুমোদিত পদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই খালি। তিনি জানান, মন্ত্রণালয় দেশব্যাপী শূন্য পদ পূরণের উদ্যোগ নিয়েছে এবং আশা করা হচ্ছে, শিগগিরই এই সংকট কাটিয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে প্রত্যাশিত সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
সামগ্রিকভাবে এই ঘটনা প্রশ্ন তুলে দেয়—শুধু ব্যয়বহুল অবকাঠামো নির্মাণ করলেই কি জনসেবা নিশ্চিত হয়? পর্যাপ্ত জনবল ও চিকিৎসক নিয়োগ ছাড়া এই ধরনের স্থাপনা যে কেবল একটি স্থাপত্যিক কাঠামো হয়েই থেকে যায়, নড়াইলের এই স্বাস্থ্যকেন্দ্র তার একটি জীবন্ত উদাহরণ।

