জুলাই গণ-আন্দোলনের পর দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকার সরকারি উন্নয়ন ব্যয়ে শৃঙ্খলা ফেরাতে এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় নেওয়া এবং অর্থনৈতিকভাবে অযৌক্তিক বলে চিহ্নিত ১২ হাজার ৩২৬ কোটি টাকার ২৯টি উন্নয়ন প্রকল্প বাতিল করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সরকার প্রায় ৫ হাজার ৮৪৭ কোটি টাকা সাশ্রয় করতে পেরেছে বলে জানিয়েছে পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)।
আইএমইডির মূল্যায়নে উঠে এসেছে, বাতিল হওয়া এসব প্রকল্পের একটি বড় অংশই অতীত সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ফল। প্রকল্প অনুমোদনের সময় যথাযথ সম্ভাব্যতা যাচাই, ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণ কিংবা বাস্তবায়ন সক্ষমতা বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। ফলে বছরের পর বছর ধরে প্রকল্প চললেও বাস্তবে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি, কোথাও আবার কাজ শুরুই হয়নি।
বাতিল হওয়া প্রকল্পগুলোর মধ্যে সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো উদাহরণ বাংলাদেশ রেলওয়ের একটি বড় প্রকল্প। ২০১৬ সালে ২০০টি মিটার গেজ যাত্রীবাহী কোচ কেনার জন্য নেওয়া এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৯২৮ কোটি টাকা। কিন্তু প্রায় এক দশক পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পটির অগ্রগতি ছিল মাত্র ০.১৩ শতাংশ—যা কার্যত প্রকল্প ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়।
আইএমইডির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, দুই থেকে ৯ বছর সময় পার হলেও অন্তত চারটি প্রকল্পে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। কাগজে-কলমে প্রকল্প চললেও মাঠ পর্যায়ে কাজ ছিল প্রায় অদৃশ্য।
পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এসব প্রকল্প বাতিলের আগেই সরকার ৬ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। গত সোমবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) বৈঠকে ২০২৪–২৫ অর্থবছরের এডিপি অগ্রগতি প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। সেখানেই পরিবহন, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতের একাধিক প্রকল্প বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।
পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, অতীতে অনেক প্রকল্প শুধুমাত্র রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুমোদন পেয়েছে, যার পেছনে কোনো অর্থনৈতিক যুক্তি ছিল না। রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় ঠেকাতেই এসব প্রকল্প বর্তমান অবস্থায় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, কিছু প্রকল্প কাগজে প্রয়োজনীয় মনে হলেও বাস্তবায়নের দিক থেকে ছিল সম্পূর্ণ অযোগ্য। তাই ভবিষ্যতে আরও বড় অঙ্কের অপচয় ঠেকাতে এই কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং প্রকল্প বাতিলের প্রক্রিয়া এখনো চলমান।
বাতিল হওয়া প্রকল্পগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় হয়েছে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের অধীনে। পার্বত্য তিন জেলায় সীমান্ত সড়ক নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ৭৫২ কোটি টাকা, যা প্রায় পুরো বরাদ্দের সমান। অথচ প্রকল্পটি কাঙ্ক্ষিত সুফল দিতে ব্যর্থ হওয়ায় শেষ পর্যন্ত তা বাতিল করা হয়।
এ ছাড়া জামালপুর–ধনুয়া–কামালপুর–রৌমারী–দাটভাঙ্গা জেলা মহাসড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্প প্রায় অর্ধেক কাজ শেষ হওয়ার পরও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। একইভাবে সাত বছর ধরে চলা কয়েকটি জেলা মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পও মাঝপথে থেমে গেছে।
কিছু প্রকল্প ছিল একেবারেই প্রস্তুতি ছাড়া অনুমোদিত। বাংলাদেশ টেলিভিশনের ছয়টি পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্র স্থাপন প্রকল্পে এক টাকাও খরচ না করেই প্রকল্প বাতিল করা হয়েছে, ফলে পুরো অর্থই সাশ্রয় হয়েছে। খুলনায় বঙ্গবন্ধু নভোথিয়েটার প্রকল্পে ব্যয় হয়েছিল মাত্র ০.১৩ শতাংশ, তবু অর্থনৈতিক যুক্তি না থাকায় সেটিও বন্ধ করে দেওয়া হয়।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে এনজিওদের মাধ্যমে বাস্তবায়নযোগ্য সাতটি প্রকল্পেও অনিয়মের অভিযোগ উঠে আসে। এসব প্রকল্পে ৮ কোটি ৮৬ লাখ টাকা ব্যয় হলেও রাজনৈতিক প্রভাব ও অপব্যবহারের অভিযোগে প্রকল্পগুলো বাতিল করা হয়। এর ফলে সরকার প্রায় ১৭৭ কোটি টাকা সাশ্রয় করেছে।
দীর্ঘদিন ধরে চলা কিছু ঐতিহাসিক স্মৃতিসংশ্লিষ্ট প্রকল্পও এই তালিকা থেকে রেহাই পায়নি। মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি জাদুঘর নির্মাণ প্রকল্পে ২২০ কোটি টাকা ব্যয় হওয়ার পর সেটিও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা কর্মকর্তারা জানান, দীর্ঘসূত্রতা ও বারবার সংশোধনের কারণে এসব প্রকল্পের অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা নষ্ট হয়ে যায়।
পরিকল্পনা কমিশনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, কোনো প্রকল্পে কিছু অর্থ ব্যয় হয়েছে বলেই সেটি জোর করে চালিয়ে যাওয়ার যে পুরোনো মানসিকতা ছিল, সরকার সেখান থেকে সরে এসেছে। অর্থনৈতিক যুক্তি না থাকলে এবং বাস্তবায়নের সক্ষমতা না থাকলে প্রকল্প বাতিল করাই রাষ্ট্রের জন্য উত্তম সিদ্ধান্ত।
পরিকল্পনা কমিশন জানিয়েছে, ভবিষ্যতে যাতে রাজনৈতিক বিবেচনায় অযৌক্তিক প্রকল্প অনুমোদন না পায়, সে জন্য নতুন প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে কঠোর যাচাই-বাছাই ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে। একই সঙ্গে চলমান প্রকল্পগুলোর কার্যকারিতাও নিয়মিত মূল্যায়ন করা হবে।
সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, এই সিদ্ধান্ত শুধু অর্থ সাশ্রয়ের জন্য নয়—বরং উন্নয়নের নামে দীর্ঘদিন ধরে চলা অপচয়ের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার একটি স্পষ্ট বার্তা।

