পবিত্র রমজান শুরু হতে এখনো প্রায় এক মাস বাকি। অথচ এরই মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে অস্বস্তি দেখা দিয়েছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে সয়াবিন তেল, পাম অয়েল, চিনি, ডাল, ছোলা ও আদার দাম বেড়েছে। আমদানির পরিমাণ বাড়ানো হলেও পাইকারি ও খুচরা—দুই বাজারেই এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
ব্যবসায়ীদের দাবি, রমজান সামনে রেখে এবার গত বছরের একই সময়ের তুলনায় অনেক পণ্যের আমদানি প্রায় দ্বিগুণ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত বছরের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে আমদানির জন্য খোলা ঋণপত্রের (এলসি) বিপরীতে পণ্য আসতেও শুরু করেছে। তবে চট্টগ্রাম বন্দরে দীর্ঘসূত্রতার কারণে এসব পণ্য সময়মতো বাজারে পৌঁছাতে পারছে না। এতে সরবরাহে চাপ তৈরি হচ্ছে এবং বাড়ছে দাম।
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, দেশের অন্যতম বড় পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে ছোলার দাম কেজিপ্রতি ৫ টাকা বেড়ে মানভেদে ৭০ থেকে ৭৫ টাকায় দাঁড়িয়েছে। অ্যাংকর ডালের দাম বেড়েছে কেজিতে ২ টাকা, এখন বিক্রি হচ্ছে ৪৫ থেকে ৪৮ টাকায়।
পাশাপাশি পাইকারি পর্যায়ে প্রতি মণ (৪০ কেজি) চিনির দাম ১০০ টাকা বেড়ে হয়েছে ৩ হাজার ৫০০ টাকা এবং পাম অয়েলের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৯৯০ টাকায়। আদা ও রসুনের দামও ঊর্ধ্বমুখী। এর প্রভাব ইতিমধ্যে খুচরা বাজারে পড়তে শুরু করেছে।
সরকারি বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) সাম্প্রতিক বাজারদরের প্রতিবেদনেও দেখা গেছে, রাজধানীর খুচরা বাজারে গত এক সপ্তাহে সয়াবিন তেল, পাম অয়েল ও আদার দাম বেড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, রমজান এলেই বাজারে একটি চেনা চিত্র ফিরে আসে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস)-এর সাবেক মহাপরিচালক মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, প্রতিবছরই রমজানের আগে কোনো না কোনো অজুহাতে পণ্যের দাম বাড়ানো হয়। কিন্তু সরকারিভাবে কঠোর ও কার্যকর উদ্যোগের অভাব চোখে পড়ে।
তার ভাষায়, এ ধরনের অন্যায্য মূল্যবৃদ্ধি রোধ করা না গেলে রমজানে সাধারণ মানুষকে বড় ভোগান্তিতে পড়তে হবে।
ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি ও সাবেক সচিব এ এইচ এম শফিকুজ্জামান বলেন, রমজান শুরু না হতেই পণ্যের দাম বাড়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তার মতে, অনেক ব্যবসায়ী রমজানকে মুনাফার সুযোগ হিসেবে দেখেন।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, সরকার যখন বলছে পর্যাপ্ত পণ্য আমদানি হয়েছে, তখন বাজারে দাম বাড়ছে কেন? বাজার নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হলেও কার্যকর মনিটরিং চোখে পড়ছে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে শতাধিক পণ্যবাহী জাহাজে ৪৫ লাখ টনের বেশি ভোগ্যপণ্য খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে গম, ভুট্টা, সয়াবিন, ছোলা, ডাল, ভোজ্য তেল ও চিনি—যেগুলো রমজানে চাহিদার শীর্ষে থাকে।
ভোগ্যপণ্য আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান নাবিল গ্রুপের অ্যাসিস্ট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার মো. জামশেদ আরেফিন জানান, লাইটার জাহাজ সংকটের কারণে বন্দরে ছোলা, গম, মসুর ও মটর ডাল আটকে আছে। দ্রুত খালাস সম্ভব হলে বাজারে সরবরাহ বাড়বে এবং দাম কিছুটা স্থিতিশীল হতে পারে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আসন্ন রমজানের বাজার স্থিতিশীল রাখতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ নিত্যপণ্যের আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়েছে। গত সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে খোলা এলসির পরিমাণ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায়—
সয়াবিন তেলে ৩৬ শতাংশ, চিনিতে ১১ শতাংশ, মসুর ডালে ৮৭ শতাংশ, ছোলায় ২৭ শতাংশ, মটর ডালে ২৯৪ শতাংশ এবং খেজুরে ২৩১ শতাংশ বেশি।
শুধু সেপ্টেম্বরেই ৬.২৯ বিলিয়ন ডলার এবং অক্টোবরে ৫.৬৪ বিলিয়ন ডলারের এলসি খোলা হয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) জানিয়েছে, ভোজ্য তেল, চিনি ও ডালের মতো পণ্যে শুল্ক ও কর যৌক্তিক পর্যায়ে রাখা হয়েছে, যাতে আমদানির ব্যয় কমে। কিন্তু বাস্তব বাজারে এর সুফল এখনো পাচ্ছেন না ভোক্তারা।
রমজান সামনে রেখে বাজারে পণ্যের জোগান বাড়ানোর কাগুজে প্রস্তুতি থাকলেও বাস্তবে সরবরাহ, তদারকি ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বন্দর জট, নজরদারির অভাব ও বাজারের অস্বচ্ছতা যদি দ্রুত কাটানো না যায়, তাহলে রমজান শুরু হওয়ার আগেই মূল্যচাপ আরও বাড়তে পারে—এই আশঙ্কাই এখন বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে।

