অন্তর্বর্তী সরকার তার মেয়াদের শেষ প্রান্তে এসে একের পর এক বড়, দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা এই পদক্ষেপকে ‘পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের হাত বেঁধে দেওয়া’ হিসেবে দেখছেন। এসব সিদ্ধান্তের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হলো চট্টগ্রাম বন্দরের নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তি।
এর আগে, ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে ৫৫০ মিলিয়ন ডলারে লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য ডেনমার্কের এপিএম টার্মিনালসের সঙ্গে ৩৩ বছরের চুক্তি করা হয়েছিল। একই সময়ে, সুইজারল্যান্ডের মেডলগ এসএ ২২ বছরের চুক্তিতে পানগাঁও নদীবন্দর পরিচালনার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
তবে এখানে একটি বড় পার্থক্য হলো—মেডলগের নিয়োগে উন্মুক্ত দরপত্র প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে, কিন্তু লালদিয়া ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের ক্ষেত্রে কোনো প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র হয়নি। এ কারণে, অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষের দিকে এসে এসব সিদ্ধান্তের সমালোচনা তীব্র হচ্ছে।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, “নীতিগতভাবে এটি নৈতিক নয়। অন্তর্বর্তী প্রশাসনের শেষ সময়ে দেশের ভবিষ্যৎকে বহু বিলিয়ন ডলারের দায়ে আবদ্ধ করা উচিত নয়। এটি পরিকল্পিত হোক বা অবহেলাবশত, আগামী সরকারের জন্য অর্থনীতি পরিচালনা করা আরও কঠিন করে তুলছে।”
বন্দরসংক্রান্ত চুক্তির পাশাপাশি, সরকার বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের জন্য ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার প্রক্রিয়া দ্রুত এগোচ্ছে। একই সময়ে, ১১৮ জন ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।
রাষ্ট্রনিযুক্ত একটি কমিশন সরকারি কর্মচারীদের বেতন সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়েছে। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছেন, এই বর্ধিত বেতন কার্যকর হলে সরকারি অর্থব্যবস্থা আরও অস্থিতিশীল হয়ে পড়তে পারে। এ সব কর্মকাণ্ড পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের ওপর বড় আর্থিক ও রাজনৈতিক বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।
ড. আনু মুহাম্মদ মন্তব্য করেছেন, “বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এসব চুক্তিতে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। শেষ মুহূর্তে এমন তড়িঘড়ি এবং রাজনৈতিক দল ও জনগণের মতামত উপেক্ষা করা আগের স্বৈরাচারী শাসনের কথা মনে করিয়ে দেয়।” তিনি আরও বলেন, “উল্টো তারা এমন অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া চালু রাখছে, যা মানুষকে দীর্ঘমেয়াদি সংকটে ঠেলে দেবে।”
অন্তর্বর্তী সরকার মীরসরাইয়ে প্রস্তাবিত প্রতিরক্ষা শিল্প অঞ্চলের জন্য প্রায় ৮৫০ একর জমি বরাদ্দের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। লক্ষ্য হলো দেশীয় সামরিক উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো এবং বৈশ্বিক প্রতিরক্ষা উৎপাদন বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্ত করা।
বেজা জানিয়েছে, এই অঞ্চলটি রাষ্ট্রীয় কারখানার মতো হবে না; বরং বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ এবং বিদেশি অংশীদারের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে এটি পরিচালিত হবে। তবে সমালোচকরা মনে করছেন, নির্বাচনী বৈধতা ছাড়া এমন দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়া একটি অনিয়মের প্রবণতা।
নবম জাতীয় বেতন কমিশন সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে, প্রতি বছর সরকারের বেতন ব্যয় দ্বিগুণ হয়ে যেতে পারে।
বর্তমানে ১৪ লাখ কর্মচারী ও ৯ লাখ পেনশনভোগীর বেতন ও পেনশন দিতে রাষ্ট্র প্রতি বছর ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করছে। প্রস্তাবিত বেতন কাঠামো অনুযায়ী প্রতি বছরে আরও ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। অর্থনীতিবিদরা এটি ‘রাজস্ব বোমা’ বলে অভিহিত করছেন।
ড. ইউনূস সরকার ওয়াশিংটনের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনায় সাফল্য পেয়েছে। বাংলাদেশকে পোশাক রপ্তানিতে ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ থেকে ২০ শতাংশে নামানো সম্ভব হয়েছে। তবে সরকারের এই সাফল্যের মূল্যও আছে।
২০২৫ সালের শেষদিকে, রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টিসহ বহু বিলিয়ন ডলারের এক চুক্তিতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসকে ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কিনতে নির্দেশ দেওয়া হয়। বোয়িং ও এয়ারবাসের মধ্যে তুলনামূলক বিশ্লেষণ ছাড়াই এই চুক্তি করা হয়েছে। নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহ আগে বোর্ডেও হঠাৎ রদবদল হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকার আগামী ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য ১৫টি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে মাসিক ভাতা বৃদ্ধি ও উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা এই প্রক্রিয়াকে যৌক্তিক না মনে করছেন।
র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) জন্য নির্বাচনের আগে ১৬৩টি যানবাহন কেনার প্রাথমিক অনুমোদনও দেওয়া হয়েছে। এটি মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে সমালোচিত বাহিনী, যা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) ২৫ জানুয়ারি অবকাঠামো ও সামাজিক ব্যয়ের ৪৫,১৯১ কোটি টাকার ২৫টি প্রকল্প অনুমোদন করেছে। এর মধ্যে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের ব্যয় ২৫,৫৯২ কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া উত্তরাঞ্চলের ১ হাজার শয্যার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী জেনারেল হাসপাতাল প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে, যার বেশিরভাগ অর্থায়ন চীন থেকে আসবে।
জ্বালানি খাতে বড় ক্রয় প্রক্রিয়াও দ্রুত এগোচ্ছে। ২০২৬ সালে পাঁচটি এলএনজি কার্গো কিনতে সরকারের প্রস্তাব অনুমোদন পেয়েছে। প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ও ২৫২টি নতুন এজেন্সি লাইসেন্স দিয়েছে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, সব এই পদক্ষেপ পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের ওপর বড় আর্থিক চাপ সৃষ্টি করবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ মুহূর্তের এই তৎপরতা শুধুমাত্র আর্থিক সংযম বা অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ত্রুটি নয়। এটি একটি নৈতিক ও নীতিগত প্রশ্ন, যা ভবিষ্যতের সরকারের জন্য দীর্ঘমেয়াদি দায় তৈরি করছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই সরকার কর্তৃক নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো স্বচ্ছতার অভাবে মানুষের আস্থা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে হুমকির মুখে ফেলছে।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, “এখন সময় গণনা শুরু হয়ে গেছে। তাদের সময় ফুরিয়ে আসছে। উচিত ছিল প্রতিশ্রুত সংস্কারের দিকে মনোযোগ দেওয়া। প্রশ্ন হলো, তারা কি পরিকল্পিতভাবে নাকি অনিচ্ছাকৃতভাবে পরবর্তী সরকারের জন্য কঠিন পরিস্থিতি তৈরি করছে?”

