ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল জনগণকে নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। বিএনপি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামি ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সহ বড় দলগুলো বিশেষ করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের উন্নয়নের বিষয়টি তুলে ধরছে।
তবে দেশীয় অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি এই জ্বালানি খাতের উন্নয়নে কীভাবে আর্থিক চাপ কমানো হবে, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম কমিয়ে সাধারণ নাগরিকের সুবিধা নিশ্চিত করা হবে, এবং আমদানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে স্বনির্ভরতা তৈরি হবে—এসব বিষয়ে এখনও কোনো সুস্পষ্ট রূপরেখা প্রকাশ হয়নি। অর্থাৎ, ভোটের আগে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতির মাঝেও বাস্তব পরিকল্পনার অভাব স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে।
উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে বিদ্যুৎ বিক্রি করায় বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) আর্থিক ঘাটতি ইতিহাসের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। কিন্তু বিপিডিবি সরাসরি বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর বিকল্প খুঁজছে না। পরিবর্তে তারা পরিকল্পনা করছে, নির্বাচনের পর বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি) দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব দাখিল করবে। বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা গত ২৯ জানুয়ারি কমিশনের ফার্নেস অয়েলের দাম পুনর্নির্ধারণ নিয়ে এক গণশুনানিতে এ তথ্য জানান। তবে পাইকারি নাকি খুচরা পর্যায়ে দাম বাড়ানো হতে পারে, সে বিষয়ে কোনো ইঙ্গিত দেওয়া হয়নি।
বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক সংকটের মূল কারণ হলো উচ্চমূল্যের গ্যাস ও জ্বালানি তেল আমদানি করে বিদ্যুৎ উৎপাদন। এই আমদানি দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে দীর্ঘদিন ধরে চাপের মধ্যে রাখছে। গত দেড় দশকে দাম কয়েকবার বাড়ানো হলেও খাতের আর্থিক সচ্ছলতা ফিরেনি। বরং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার কারণে জ্বালানি খাত আরও প্রভাবিত হয়েছে।
এলএনজি আমদানিতে অর্থ সংকট, এলপিজি সরবরাহ কমে যাওয়া এবং সাশ্রয়ী মূল্যে জ্বালানি ক্রয় করতে না পারার কারণে ভোক্তারা সমস্যায় পড়ছেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন অঞ্চলে যেকোনো ধরনের সংঘাত বাংলাদেশে জ্বালানি খাতকে আরও অস্থিতিশীল করতে পারে।
দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বর্তমান পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আসন্ন নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি মানুষের প্রত্যাশা বড়। বিশেষ করে তারা চায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ, সাশ্রয়ী মূল্যে গ্যাস-বিদ্যুৎ পাওয়া এবং বিগত সময়ের আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির সুষ্ঠু তদন্ত। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে জ্বালানি খাতকে বড় আকারে তুলে ধরছে। খাতটি কীভাবে পুনর্গঠন করা যায়, সে বিষয়ে রূপরেখা তৈরি ও প্রচারও শুরু হয়েছে।
দেশের অন্যতম বৃহৎ দল বিএনপি এখনও আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী ইশতাহার প্রকাশ করেনি। তবে দলের নীতিনির্ধারকরা জানিয়েছেন, ঘোষিত ‘রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের ৩১ দফা’ই নির্বাচনী ইশতাহারের মূল ভিত্তি হবে। এই ৩১ দফার মধ্যে ১৮ নম্বর দফায় বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ, খনিজ ও জ্বালানি খাতের আধুনিকায়ন এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা হবে।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ খাতে দায়মুক্তি আইনসহ সব কালাকানুন বাতিল করা হবে। জনস্বার্থবিরোধী কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো থেকে বিদ্যুৎ কেনায় চলমান সীমাহীন দুর্নীতি বন্ধ করা হবে। পাশাপাশি আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য এবং মিশ্র এনার্জিনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং উপেক্ষিত গ্যাস ও খনিজ সম্পদ আবিষ্কার ও আহরণের জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, ‘বিএনপির ৩১ দফার আলোকে নির্বাচনী ইশতাহারে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের পরিকল্পনার বিষয়গুলো তুলে ধরা হবে। ক্ষমতায় এলে স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধানের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। ভালো ফলাফল পেলে ধাপে ধাপে আমদানিনির্ভরতা কমানো হবে। এছাড়া বিগত সময়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে রাষ্ট্রীয় যে গ্যারান্টি রয়েছে, সেগুলো নিয়ে জনগণের জানার অধিকার নিশ্চিত করা হবে এবং যা দেশের অর্থনীতিতে রক্তক্ষরণ ঘটাচ্ছে, সেগুলো সমাধান করা হবে।’
তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের বৃহৎ গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো এখন গ্যাসের অভাবে চালানো যাচ্ছে না। এই কেন্দ্রগুলো কীভাবে চালু রাখা হবে, গ্যাসের জোগান কোথা থেকে আসবে, এবং ব্যয়বহুল বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর আইনি জটিলতা কীভাবে সমাধান হবে—এসব বিষয়ে স্পষ্ট পরিকল্পনা থাকা জরুরি। বর্তমানে দেশ বছরে তেল, গ্যাস ও কয়লা মিলিয়ে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকার জ্বালানি আমদানি করছে। এ বিপুল আমদানি দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করছে। স্থানীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানিনির্ভরতা কমানোর বিষয়েও এখনও বিএনপির নির্বাচনী প্রচারণায় স্পষ্ট রূপরেখা দেখা যায়নি।
দেশের বিভিন্ন জেলায় এবং রাজধানীতে বিএনপি নির্বাচনী জনসমাবেশ করছে। দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রচারণায় স্থানীয় সংকটগুলো উঠে আসছে। কিন্তু জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রাষ্ট্রের বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতের বড় সমস্যাগুলো কিভাবে সমাধান হবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়।
গত ২৮ জানুয়ারি রাতে উত্তরার আজমপুর ঈদগাহ মাঠে নির্বাচনী জনসভায় বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান উত্তরাবাসীর জন্য পানি ও গ্যাস সমস্যার সমাধানের প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি বলেন, ‘উত্তরাবাসী প্রতি মাসে বিল দেয়, কিন্তু পানি ও গ্যাস সঠিকভাবে পায় না। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষ বিজয়ী হলে সবার আগে এই দুই সমস্যার সমাধান করা হবে।’
গ্যাসকূপ অনুসন্ধান প্রসঙ্গে তারেক রহমান আরও বলেন, ‘দেশে নতুন গ্যাসকূপ খুঁজে বের করার কাজে অতীতে বাধা দেয়া হয়েছে। এটি সমাধান করতে হবে। নতুন কলকারখানা গড়ে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করতে হবে।’
তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের জ্বালানি সংকটের মূল সমস্যা হলো স্থানীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়া এবং আমদানির বৃদ্ধি। অতীতে আওয়ামী লীগ সরকার যেভাবে আমদানি করে গ্যাসের চাহিদা মেটাতে চেষ্টা করেছে, তাতে দেশের আর্থিক পরিস্থিতি মারাত্মক প্রভাবিত হয়েছে। এই চাপ কমাতে দেশে দেশি-বিদেশী বিনিয়োগ বাড়ানোর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার প্রয়োজন, কিন্তু এখনো এ বিষয়ে কোনো স্পষ্ট রূপরেখা নেই।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এখনও তাদের নির্বাচনী ইশতাহার প্রকাশ করেনি। তবে দলটি গত ২০ জানুয়ারি রাজধানীতে একটি পলিসি সামিট করেছে। সেখানে তারা ক্ষমতায় এলে আগামী তিন বছরে সব শিল্পে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির দাম স্থিতিশীল রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে কীভাবে দাম নিয়ন্ত্রণ করা হবে বা আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানো হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই।
দেশের বিদ্যুৎ খাতও বর্তমানে ইতিহাসের যে কোনো সময়ের চেয়ে আর্থিকভাবে দুরবস্থায় আছে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) প্রায় দেউলিয়া হওয়ার পথে। গত অর্থবছরে সরকারের ৩৮,৫০০ কোটি টাকার ভর্তুকি নেওয়া সত্ত্বেও বিপিডিবি ১৭,০০০ কোটি টাকা নিট লোকসান করেছে। আর্থিক ক্ষতি কমাতে সংস্থাটি নির্বাচনের পর বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি প্রস্তাব করবে বিইআরসিতে।
জামায়াতে ইসলামী এ সংকট কীভাবে সামলাবে, এমন প্রশ্নের জবাবে দলের নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বলেন, ‘আমি টেকনিক্যাল পারসন না। আমাদের টেকনিক্যাল কমিটি কাজ করছে। তবে আমরা মনে করি, মূল সমস্যা হলো দুর্নীতি। এটি বন্ধ করতে পারলে স্বাভাবিকভাবেই দাম কমে যাবে।’
গত বছরের আগস্টে ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’ প্রতিষ্ঠার সময় ২৪ দফা ইশতাহার ঘোষণা করে এনসিপি। ওই ইশতাহারের ১৯তম দফায় বলা হয়, জাতীয় সম্পদের ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে জনগণের সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠা করা হবে। প্রাকৃতিক সম্পদ অনুসন্ধান ও আহরণে দেশীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি করার অঙ্গীকারও করা হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার এনসিপি তাদের নির্বাচনী ইশতাহার প্রকাশ করেছে। ‘তারুণ্য ও মর্যাদার ইশতেহার’ শীর্ষক এ ইশতাহারে বৈচিত্র্যময় জ্বালানি মিশ্রণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। ইশতাহারে বলা হয়েছে, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা উন্নয়নশীল অর্থনীতির কৌশলগত অগ্রাধিকারগুলোর একটি।
পরবর্তী পাঁচ বছরের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদন করা হবে। পাশাপাশি লোড ফোরকাস্ট, গ্রিড আপগ্রেড, স্টোরেজ প্রযুক্তি, ওভার ক্যাপাসিটি এবং সিস্টেম লস কমানোর পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত। লক্ষ্য রাখা হয়েছে, সিস্টেম লস ১০-১২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫-৬ শতাংশে নামানো।
শিল্প খাতে বিদ্যুতের পিক ট্যারিফ কমিয়ে ১৫ টাকা থেকে ১৩ টাকা এবং অফ-পিক ট্যারিফ ১১ টাকা থেকে ৯ টাকায় নামানোর পরিকল্পনা রাখা হয়েছে। সরকারি স্থাপনায় রুফটপ সোলার বাধ্যতামূলক করা হবে এবং নদীর তীরভিত্তিক সোলার প্রকল্প চালু করা হবে। এছাড়া বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে ‘এনার্জি ইফিশিয়েন্সি মাস্টারপ্ল্যান’ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
দেশের জ্বালানি খাতের উন্নয়নে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিশ্রুতি থাকলেও কীভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় এগুলো বাস্তবায়ন হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট রূপরেখা প্রকাশিত হয়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যমান বাস্তবায়ন পরিস্থিতির আলোকে এসব প্রতিশ্রুতি কতটা কার্যকর হবে, তা অনিশ্চিত। তাদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকার জ্বালানি খাতে লোকসান কমানো ও সংস্কারে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছিল, কিন্তু এসব পদক্ষেপ বিদ্যুৎ খাতকে সুবিধাজনক অবস্থায় আনতে পারেনি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে এনসিপির পলিসি ও রিসার্চ উইংয়ের সদস্য আলাউদ্দিন মোহাম্মদ বলেন, ‘আমাদের জ্বালানি নীতিতে বহুমুখীকরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এটি অতীতের প্রথাগত জ্বালানি চিন্তা থেকে বের হতে সাহায্য করবে। স্থাপত্যকলা থেকে শুরু করে একটি সাশ্রয়ী ও টেকসই আরবানাইজেশন নেটওয়ার্ক গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে দেশের জিডিপি বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে জ্বালানির ব্যবহারিক অনুপাত বাড়ানো যায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘কুইক রেন্টালের মাধ্যমে দেশের বিদ্যুৎ খাতকে বেসরকারি খাতনির্ভর করা হয়েছিল। ফলে সরকারের পাবলিক সেক্টরের আর্থিক সক্ষমতা অনেকটাই কমে গেছে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে ৪০ শতাংশ যানবাহন ইলেকট্রিক যান (ইভি) রূপান্তর করা হবে, পাশাপাশি বেসরকারি যানবাহনও ধাপে ধাপে ইভিতে রূপান্তরের নীতিমালা বাস্তবায়ন করা হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’

