ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন আগামী ২৬ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে পারে বলে জানা গেছে। এ লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে ২৬ ফেব্রুয়ারি অধিবেশন শুরুর বিষয়ে আলোচনা ও প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে সংসদ সচিবালয় সূত্রে তথ্য মিলেছে।
তবে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে অধিবেশন আহ্বানের নির্দেশনা জারি হয়নি। সংসদ সচিবালয়ের সচিব কানিজ মওলা জানিয়েছেন, শপথ গ্রহণের এক মাসের মধ্যে অধিবেশন বসার সাংবিধানিক বিধান রয়েছে। আনুষ্ঠানিক ঘোষণা পেলেই পরবর্তী প্রস্তুতি চূড়ান্ত করা হবে।
সংবিধান অনুযায়ী, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফলের গেজেট প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে রাষ্ট্রপতিকে নতুন সংসদের অধিবেশন আহ্বান করতে হয়। আর এই আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর লিখিত পরামর্শক্রমে জারি করা হয়।
গত ১৩ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী সদস্যদের গেজেট প্রকাশিত হয়েছে। ফলে আগামী ১৪ মার্চের মধ্যেই প্রথম অধিবেশন বসা বাধ্যতামূলক। এর আগে ১৭ ফেব্রুয়ারি নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ গ্রহণ করেছেন।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে ভোটগ্রহণ হয়। এর মধ্যে ২৯৭টির ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছে।
ফলাফলে দেখা গেছে—
-
বিএনপি এককভাবে পেয়েছে ২০৯টি আসন
-
তাদের জোটের শরিকরা জয়ী হয়েছে আরও ৩টি আসনে
-
স্থগিত থাকা দুটি আসনেও বিএনপির প্রার্থীরা এগিয়ে রয়েছেন
অন্যদিকে—
-
জামায়াতে ইসলামী পেয়েছে ৬৮টি আসন
-
তাদের নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টি পেয়েছে ৬টি আসন
-
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস পেয়েছে ২টি আসন
-
খেলাফত মজলিস পেয়েছে ১টি আসন
-
ইসলামী আন্দোলন পেয়েছে ১টি আসন
-
স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন ৭ জন, যাদের সবাই বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী
এই ফলাফলের ভিত্তিতে সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা স্পষ্ট হলেও, বিরোধী দল ও জোটের উপস্থিতিও উল্লেখযোগ্য।
সংবিধান অনুযায়ী, নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি ভাষণ দেবেন। এই ভাষণ আগেই মন্ত্রিসভায় অনুমোদন করা হবে। এরপর অধিবেশনজুড়ে সংসদ সদস্যরা রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনা করবেন।
প্রথম দিনের কার্যক্রম সাধারণত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপে সম্পন্ন হয়—
-
স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন
-
সভাপতিমণ্ডলীর মনোনয়ন
-
প্রয়াত সদস্যদের স্মরণে শোক প্রস্তাব গ্রহণ
-
রাষ্ট্রপতির ভাষণ
রাষ্ট্রপতির ভাষণের মধ্য দিয়েই কার্যত নতুন সংসদের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়।
এবারের অধিবেশনের শুরুতেই একটি ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের পদ বর্তমানে শূন্য।
দ্বাদশ সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী পদত্যাগ করেছেন এবং ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু গ্রেপ্তার হয়েছেন। ফলে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পড়ান প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন।
সংসদের কার্যপ্রণালি বিধিতে এ ধরনের পরিস্থিতিতে প্রথম দিনের বৈঠকে কে সভাপতিত্ব করবেন, সে বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা নেই। তবে অতীতে জ্যেষ্ঠ সদস্যকে দায়িত্ব দিয়ে স্পিকার নির্বাচনের নজির রয়েছে। এবারও তেমন কোনো পদ্ধতি অনুসরণ করা হতে পারে বলে জানা গেছে।
ক্ষমতাসীন দলের সংসদীয় দল ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সংসদ নেতা নির্বাচিত করেছে। তবে স্পিকার, উপনেতা ও চিফ হুইপের পদ এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
অন্যদিকে বিরোধী জোট তাদের সংসদীয় দল গঠন করে ইতোমধ্যে বিরোধীদলীয় নেতা, উপনেতা ও চিফ হুইপ মনোনীত করেছে।
জুলাই জাতীয় সনদ ও ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী, এবার ডেপুটি স্পিকার বিরোধী দল থেকে হওয়ার কথা রয়েছে। বিষয়টি বাস্তবায়িত হলে সংসদে ক্ষমতা ও বিরোধী পক্ষের মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ বার্তা যেতে পারে।
সব মিলিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে নতুন প্রত্যাশা ও কৌতূহল। সাংবিধানিক সময়সীমা সামনে রেখে প্রস্তুতি চলছে জোরেশোরে।
এখন দেখার বিষয়—২৬ ফেব্রুয়ারি সত্যিই কি বসবে প্রথম অধিবেশন, নাকি আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে আরও কিছুটা সময় লাগবে। তবে যা-ই হোক, নতুন সংসদের যাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে এক গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপটে, যেখানে রাজনৈতিক সমীকরণ ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া—দুটিই সমানভাবে আলোচনায়।

