একুশের প্রথম প্রহর। যখন গোটা জাতি বিনম্র শ্রদ্ধায় ভাষা শহীদদের স্মরণ করছে, যখন টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া মুখরিত ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ গানের সুরে—ঠিক তখনই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল শহীদ মিনারে রচিত হলো এক কলঙ্কিত অধ্যায়। সদ্য নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও বিএনপির একসময়ের অগ্নিকন্যা ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানাকে ফুল দিতে বাধা দিয়ে ফিরিয়ে দিল তার নিজেরই পুরনো দলের স্থানীয় নেতাকর্মীরা।
এই ঘটনা কেবল একজন জনপ্রতিনিধিকে অপমান নয়, বরং একুশের চেতনা আর গণতান্ত্রিক সহনশীলতার ওপর এক চরম আঘাত।
প্রতিহিংসার রাজনীতি বনাম অর্জনের সমীকরণ
প্রশ্ন উঠেছে, সরাইল উপজেলা বিএনপির একাংশ রুমিন ফারহানাকে বাধা দিয়ে আসলে কী অর্জন করতে চাইল?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে কোনো আদর্শিক লড়াই নেই, আছে কেবল ‘পরাজয়ের গ্লানি’ আর ‘ব্যক্তিগত আক্রোশ’।
- আধিপত্য বিস্তারের শেষ চেষ্টা: নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পর স্থানীয় বিএনপির একটি অংশ জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। রুমিন ফারহানা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বিপুল ভোটে জয়ী হওয়ায় তাদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব সংকটে। শহীদ মিনারে এই ন্যাক্কারজনক বাধা মূলত একটি বার্তা দেওয়ার চেষ্টা—‘দলে না থাকলে এখানে তোমার ঠাঁই নেই’। কিন্তু ফুল দিতে বাধা দিয়ে তারা জনসমর্থন নয়, বরং সাধারণ মানুষের ঘৃণা কুড়িয়েছে।
- নেতৃত্বের সংঘাত ও ভয়ের সংস্কৃতি: আনোয়ার হোসেন মাস্টারের অনুসারীদের এই আক্রমণাত্মক ভঙ্গি প্রমাণ করে, তারা রাজনৈতিকভাবে রুমিনকে মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়ে এখন পেশীশক্তির আশ্রয় নিচ্ছে। তারা দেখাতে চেয়েছে যে, মাঠ পর্যায়ের নিয়ন্ত্রণ এখনো তাদের হাতে। কিন্তু সত্য হলো, একটি পবিত্র স্থানে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে তারা দলের ভাবমূর্তিকেই সংকটে ফেলেছে।
- কেন্দ্রীয় হাইকমান্ডকে বার্তা দেওয়া: সম্ভবত স্থানীয় এই গোষ্ঠীটি কেন্দ্রকে বোঝাতে চায় যে, রুমিনকে দলে ফিরিয়ে নিলে তৃণমূল তা মেনে নেবে না। কিন্তু এই ‘প্রতিবাদ’ যদি শারীরিক লাঞ্ছনা বা বাধা দেওয়ার পর্যায়ে পৌঁছায়, তবে তা রাজনীতির শিষ্টাচারকে ধূলিসাৎ করে দেয়।
একুশের চেতনায় এ কোন অন্ধকার?
যে ভাষার জন্য রফিক-সালামরা রক্ত দিয়েছিলেন, সেই ভাষার মাসে, সেই শহীদ মিনারের পবিত্র বেদীতে দাঁড়িয়ে রাজনীতির নোংরা খেলা জাতিকে স্তম্ভিত করেছে। রুমিন ফারহানা যখন বলেন, “পরাজয়ের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য এই হামলার চেষ্টা,” তখন প্রশ্ন জাগে—গণতন্ত্রে কি তবে ভিন্নমতের কোনো স্থান নেই? নিজ দলের সাবেক সহযোদ্ধার ওপর এমন আক্রমণ কি তবে একুশের সেই উদার নৈতিকতার পরিপন্থী নয়?
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে রাত পৌনে ১২টার দিকে রুমিন ফারহানা শহীদ মিনারে পৌঁছান। তিনি যখন বেদির সামনে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য দাঁড়িয়েছিলেন, তখন সরাইল উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে একদল নেতাকর্মী সেখানে এসে ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান দিতে শুরু করেন। একপর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং সংসদ সদস্যের আনা ফুলের তোড়াটি ছিঁড়ে ফেলা হয়।
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে কর্মী-সমর্থক ও পুলিশের পাহারায় তিনি শহীদ মিনার এলাকা ত্যাগ করেন। এই ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে রুমিন ফারহানার ক্ষুব্ধ সমর্থকরা ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের শাহবাজপুর গেট এলাকায় টায়ার জ্বালিয়ে রাস্তা অবরোধ করেন। প্রায় এক ঘণ্টা স্থায়ী এই অবরোধে মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হয়।
জাতির সামনে কঠিন বাস্তবতা
এই ঘটনা কেবল রুমিন ফারহানার ব্যক্তিগত অপমান নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক গভীর ক্ষতের বহিঃপ্রকাশ। একজন নারী সংসদ সদস্যকে রাতের অন্ধকারে হেনস্তা করে যারা বীরত্ব জাহির করতে চায়, তারা আসলে আদর্শিক দেউলিয়াত্বই প্রকাশ করেছে। সরাইল থানার ওসি জানিয়েছেন আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে, কিন্তু প্রশ্ন হলো—মানসিকতার পরিবর্তন করবে কে?
রাজনীতিতে হার-জিত থাকবেই। কিন্তু শহীদ মিনার কোনো যুদ্ধক্ষেত্র নয়। রুমিন ফারহানাকে বাধা দিয়ে স্থানীয় বিএনপি হয়তো সাময়িকভাবে তাকে ফুল দিতে দেয়নি, কিন্তু তারা নিজেদের রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বকেই জাতির সামনে নগ্ন করে দিয়েছে। এই বিভেদ আর প্রতিহিংসার সংস্কৃতি যদি এখনই বন্ধ না হয়, তবে আমাদের মহান ভাষা আন্দোলনের ত্যাগ আর গণতন্ত্রের স্বপ্ন—উভয়ই সুদূরপরাহত হবে।
এই ঘটনা সম্পর্কে জনগণের প্রতিক্রিয়ায় উঠে এসেছে, সরাইলের এই ঘটনার বিচার চায় মানুষ। কারণ, যে হাত শহীদ মিনারে ফুল দিতে বাধা দেয়, সেই হাত আর যাই হোক—গণতন্ত্রের রক্ষক হতে পারে না।

