স্থলভাগ (অনশোর) ও সমুদ্রে (অফশোর) নতুন করে গ্যাস অনুসন্ধানে দরপত্র আহ্বানের পরিকল্পনা করছে সরকার। দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম ১০০ দিনের মধ্যেই উৎপাদন-অংশীদারি চুক্তি (পিএসসি) মডেল চূড়ান্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চলতি বছরের মধ্যেই দরপত্র প্রক্রিয়া শেষ করে ২০২৭ সালের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তি সই করার পরিকল্পনা রয়েছে।
২০২৪ সালের মার্চে আগের সরকার গভীর সমুদ্রে বৈশ্বিক কোম্পানির জন্য দরপত্র আহ্বান করে এবং সময়সীমা সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণ করে। ২০১২ সালে ভারতের সঙ্গে এবং ২০১৪ সালে মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির পর এটি ছিল সমুদ্রের প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণের প্রথম বড় পদক্ষেপ।
তবে ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে কোনো আন্তর্জাতিক কোম্পানি দরপত্রে অংশ নেয়নি। অন্তর্বর্তী সরকার সময়সীমা তিন মাস বাড়ালেও সাড়া পাওয়া যায়নি। পরে পেট্রোবাংলা সংশোধিত নথি মন্ত্রণালয়ে পাঠালেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নতুন সরকারের জন্য রেখে দেওয়া হয়।
পিএসসি চূড়ান্তকরণ জ্বালানি খাতের বিস্তৃত ১০০ দিনের কর্মপরিকল্পনার অংশ। দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিনেই বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে এই পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন।
তিনি জানান, রমজান ও সেচ মৌসুমে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করাই এখন প্রধান অগ্রাধিকার। এরপর ধাপে ধাপে অন্যান্য পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।
রোডম্যাপ অনুযায়ী পরিকল্পনা কমিশনে জমা দেওয়া হবে—
-
৭টি অনুসন্ধান কূপ
-
৭টি উন্নয়ন কূপ
-
২টি ওয়ার্কওভার (সংস্কার) কূপ
উন্নয়ন কূপের মাধ্যমে বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রে উৎপাদন বাড়ানো হবে এবং ওয়ার্কওভার কূপের মাধ্যমে পরিত্যক্ত কূপ থেকে অবশিষ্ট গ্যাস উত্তোলন করা হবে।
লক্ষ্য অনুযায়ী, ২০২৬–২৭ অর্থবছরের মধ্যে ৪৬টি কূপ থেকে দৈনিক অতিরিক্ত ৬৫২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন করা হবে। চলমান অনুসন্ধান কার্যক্রমে আরও দুটি ড্রিলিং রিগ যুক্ত হতে পারে।
বর্তমানে বাপেক্স পাঁচটি নিজস্ব ও চারটি ভাড়াকৃত রিগ পরিচালনা করছে।
সরকার তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) অবকাঠামো উন্নয়নেও জোর দিচ্ছে। পিপিপি মডেলে স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনে একজন লেনদেন উপদেষ্টা নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে।
এছাড়া একটি ভাসমান স্টোরেজ ও রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) স্থাপন এবং ভোলা থেকে মূল ভূখণ্ডে গ্যাস আনার পাইপলাইন নির্মাণ এগিয়ে নেওয়া হবে। বাড়তি এলএনজি সরবরাহ সামলাতে গ্যাস সঞ্চালন নেটওয়ার্কও সম্প্রসারণ করা হবে।
গ্যাস চুরি ও লিকেজ কমানো সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। প্রথম ১০০ দিনে সিস্টেম লস ৬ দশমিক ৩৮ শতাংশ থেকে ৬ দশমিক ২৫ শতাংশে নামানোর লক্ষ্য রয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে তা ৪ শতাংশে নামানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ১৭৩ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস অপচয় হয়, যার বার্ষিক আর্থিক মূল্য প্রায় ৪ হাজার ৯৪ কোটি টাকা।
বিপিসির মাধ্যমে এলপিজি আমদানি অব্যাহত রাখতে নতুন কাঠামো তৈরি করা হবে। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে এলপিজি টার্মিনাল নির্মাণে জিটুজি ও পিপিপি মডেল যাচাইয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।
গভীর সমুদ্রে সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) সুবিধার রক্ষণাবেক্ষণে ঠিকাদার নিয়োগ করা হবে। ২০২৪ সালে চালুর কথা থাকলেও অপারেটর নিয়োগে দেরির কারণে এটি এখনো চালু হয়নি।
একই সঙ্গে ইস্টার্ন রিফাইনারির শোধন ক্ষমতা বছরে ১৫ লাখ টন থেকে ৪৫ লাখ টনে বাড়ানোর প্রকল্পে প্রকল্প পরিচালক ও পরামর্শক নিয়োগ দেওয়া হবে।
নীতিগত সংস্কারের অংশ হিসেবে জ্বালানি খাতের মাস্টার প্ল্যান ও প্রধান বিধিমালা সংশোধন করা হবে।
তিতাস গ্যাস কোম্পানিকে ভেঙে তিনটি প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর এবং বিপিসির আটটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠান একীভূত করে পাঁচটি কোম্পানিতে রূপান্তরের কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
দক্ষতা বৃদ্ধিতে সেমিনার, ইন-হাউস প্রশিক্ষণ এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ইনস্টিটিউটের জন্য নতুন ল্যাবরেটরি সুবিধা তৈরির উদ্যোগও রয়েছে।
সরকারের এই ১০০ দিনের রোডম্যাপ কেবল নতুন গ্যাস অনুসন্ধান নয়, বরং জ্বালানি খাতের সামগ্রিক পুনর্গঠন ও উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে তৈরি। তবে গভীর সমুদ্রে বিনিয়োগ টানতে হলে পিএসসি কাঠামোকে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার উপযোগী ও বিনিয়োগবান্ধব করতে হবে—এটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

