এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সংঘটিত সম্ভাব্য দুর্নীতি ও বিতর্কিত সিদ্ধান্ত খতিয়ে দেখার জন্য একটি ট্রানজিশন টিম বা উত্তরণকালীন দল গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি একই সঙ্গে বিদেশি ক্রয় ও চুক্তিগুলো পুনর্বিবেচনার প্রস্তাবও দিয়েছেন।
রাজধানী মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে ‘নতুন সরকারের সূচনাবিন্দু: অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে ড. ভট্টাচার্য এসব বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠানের আয়োজন করে এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকার কোনো ধরনের দুর্নীতিতে জড়িত ছিল কি না তা যাচাই করতে একটি ট্রানজিশন টিম গঠন করা জরুরি। এই টিম প্রাথমিকভাবে বিষয়গুলো যাচাই করবে, যা সরকারের জন্য পরবর্তী পদক্ষেপ সহজ করবে। দরকারে দুর্নীতি দমন কমিশনকেও যুক্ত করা যেতে পারে।”
ড. ভট্টাচার্য জানান, আন্তর্জাতিকভাবে এ ধরনের দল সাধারণত দুই ধরনের সদস্য নিয়ে গঠিত হয়—সরকারের কর্মকর্তা ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞ। প্রয়োজনে টিম ফরেনসিক তদন্তও করতে পারবে। তিনি বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সম্পাদিত বিভিন্ন ক্রয় ও বৈদেশিক চুক্তি পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন। সঠিক বিশ্লেষণ দেখাবে কোনো অনিয়ম বা ব্যত্যয় হয়েছে কি না।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, “বিগত সরকার বিদায়ের আগে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে একাধিক বৈদেশিক চুক্তি করেছে। এগুলো শুধু বন্দর ব্যবস্থাপনাতেই সীমাবদ্ধ নয়, গুরুত্বপূর্ণ অন্যান্য খাতকেও বিস্তৃত।” তিনি বলেন, এসব চুক্তি জনসমক্ষে পুরোপুরি প্রকাশিত হয়নি, ফলে নতুন সরকারের দায়িত্ব ও প্রভাব বোঝার জন্য পুনর্বিবেচনা জরুরি। যেহেতু নতুন সরকার এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন পুনর্মূল্যায়নে আগ্রহী, তাই চুক্তিগুলোও সেই প্রক্রিয়ার আওতায় আনা উচিত।
ট্রানজিশন টিমের গুরুত্ব তুলে ধরে ড. ভট্টাচার্য বলেন, “যদি টিম ফরেনসিক তদন্ত সম্পন্ন করতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতের সিদ্ধান্ত গ্রহণ অনেক সহজ হবে। এর ভিত্তিতে একটি ব্লু বুক তৈরি করা সম্ভব, যা সরকারের দায়-দেনা, বর্তমান পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যৎ করণীয় স্পষ্ট করবে।” তিনি জানান, সাধারণত বিদেশে মন্ত্রিসভা গঠনের আগেই এই কাজ শুরু করা হয় এবং দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে প্রক্রিয়াটি শেষ করা সম্ভব।
নাগরিক প্ল্যাটফর্ম ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় চলতি অর্থবছরের জন্য একটি বাস্তবসম্মত সংশোধিত বাজেট প্রণয়নেরও আহ্বান জানিয়েছে। নতুন সরকারের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় বাজেট-শৃঙ্খলা কঠোরভাবে অনুসরণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
সিপিডির অতিরিক্ত পরিচালক (গবেষণা) তৌফিকুল ইসলাম খান অনুষ্ঠানে সামষ্টিক অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা নিয়ে প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। সিপিডির আরেক সম্মাননীয় ফেলো প্রফেসর মোস্তাফিজুর রহমানও বক্তব্য দেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের অর্থনীতিতে তিনটি ‘বাধ্যতামূলক সংকট’ একসঙ্গে কাজ করছে—নাজুক সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান, এবং সংকুচিত রাজস্ব ও ব্যয়ের পরিসর।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৫ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে ঋণচাপসহ সব সূচক হালনাগাদ করা এবং বাস্তবসম্মত পূর্বাভাস অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। মিতব্যয়ী নীতি গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে সরকারি ব্যয়ের অগ্রাধিকার পুনর্নির্ধারণ, অপ্রয়োজনীয় খরচ হ্রাস এবং সংকটাপন্ন ব্যাংকগুলোর জন্য অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ থেকে বিরত থাকা। নতুন সরকারি বিনিয়োগ প্রকল্প আপাতত স্থগিত রেখে চলমান ও বৈদেশিক ঋণনির্ভর প্রকল্পে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
নাগরিক প্ল্যাটফর্ম নির্বাচনি ইশতেহারের বিশ্লেষণে জানায়, ২০৩৫ সালের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত ১৫% উন্নীত করা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় জিডিপির ৫% বরাদ্দ, এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ ২.৫% অর্জনের লক্ষ্য অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী। এটি শক্ত রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে সম্ভব। সংগঠনটি প্রস্তাব করেছে, নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা উচিত।
প্রতিবেদনে বলা হয়, শুরুতেই সঠিক দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করলে সাফল্যের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাবে। বিচক্ষণ সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি পূরণের সক্ষমতাকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করবে।

