বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান–এর নেতৃত্বাধীন সরকার দেশে পরীক্ষামূলকভাবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর ঘোষণা দিয়েছে। আগামী ১০ মার্চ থেকে এই কর্মসূচি শুরু হবে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এটি ছিল দলটির অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতি।
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে যেসব পরিবার এই কার্ড পাবে, তাদের প্রতি মাসে আড়াই হাজার টাকা দেওয়া হবে।
সরকার জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একটি উপজেলায় গিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এই কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন।
সমাজকল্যাণমন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, আপাতত অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে থোক বরাদ্দ নেওয়া হবে। তবে আগামী বাজেট থেকে এই খাতে নিয়মিত বরাদ্দ রাখা হবে।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপি তাদের ইশতেহারে নয়টি প্রধান প্রতিশ্রুতি দেয়। এর শুরুতেই ছিল ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর বিষয়টি।
ইশতেহারে বলা হয়েছিল, প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারকে সুরক্ষা দিতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করা হবে। এর মাধ্যমে প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা অথবা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য দেওয়া হবে। সময়ের সঙ্গে এই সহায়তার পরিমাণ বাড়ানো হবে।
এর আগে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকারের সময় টিসিবির মাধ্যমে স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড চালু ছিল। সেই কার্ড দিয়ে ভোক্তারা বাজারমূল্যের চেয়ে কম দামে নিত্যপ্রয়োজনীয় কিছু পণ্য কিনতে পারতেন।
কারা পাবেন এবং কীভাবে বাছাই:
সমাজকল্যাণমন্ত্রী জানান, সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এই কর্মসূচির প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
প্রথম ধাপে একটি পাইলট প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এতে ১৪টি উপজেলার একটি করে ইউনিয়নের একটি করে ওয়ার্ড বেছে নেওয়া হচ্ছে। ওই ওয়ার্ডের প্রতিটি পরিবারের একজন নারী এই কার্ড পাবেন।
মন্ত্রী বলেন, পরিবারের মা বা নারী প্রধান এই সুবিধা পাবেন। এতে নারীরা অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হবেন। এর সুফল পাবে পরিবার ও আগামী প্রজন্ম। আগামী চার মাসের মধ্যে পাইলট কার্যক্রম শেষ হবে। এরপর ধাপে ধাপে সব উপজেলায় এটি চালু করা হবে।
সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, একটি ওয়ার্ডে যারা উপযুক্ত বিবেচিত হবেন, তাদের সবাইকে এই কার্ড দেওয়া হবে। এজন্য মাঠপর্যায় থেকে সরাসরি তথ্য সংগ্রহ চলছে।
মূলত হতদরিদ্র, দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত পরিবারের মায়েরা এই সুবিধা পাবেন। পরে সারা দেশে যাচাই করে এই তিন শ্রেণির পরিবার থেকে চূড়ান্ত তালিকা তৈরি করা হবে।
মন্ত্রী বলেন, এটি নারীর ক্ষমতায়নের একটি উদ্যোগ। দীর্ঘদিন ধরে তারেক রহমান এই বিষয়টি নিয়ে কাজ করেছেন। তার সভাপতিত্বেই এটি অনুমোদন পেয়েছে।
কত টাকা ও কীভাবে দেওয়া হবে:
সরকার জানিয়েছে, কার্ডধারীরা প্রতি মাসে আড়াই হাজার টাকা পাবেন। এই অর্থ সরাসরি ব্যাংক বা মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে দেওয়া হবে।
সমাজকল্যাণমন্ত্রী বলেন, আপাতত অর্থ মন্ত্রণালয় থোক বরাদ্দ দেবে। আগামী জুনে জাতীয় বাজেটে এই খাতে নিয়মিত বরাদ্দ রাখা হবে।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, একটি কার্ডে সর্বোচ্চ পাঁচজন সদস্য ধরা হবে। তবে একান্নবর্তী পরিবারে সদস্য বেশি হলে প্রতি পাঁচজনের জন্য আলাদা কার্ড দেওয়া হবে।
একজন ব্যক্তি একাধিক ভাতা পাবেন না। তবে পরিবারের অন্য সদস্যরা প্রাপ্য সুবিধা পেতে পারবেন।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উপজেলা পর্যায়ে ইউএনওর নেতৃত্বে এবং ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে সরকারি কর্মচারীদের সমন্বয়ে কমিটি গঠন করা হবে। এই কমিটিই পুরো কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
প্রতিটি ওয়ার্ডে তদারকির জন্য একজন প্রথম শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তা থাকবেন। ভুল এড়াতে দ্বিস্তর বিশিষ্ট যাচাই ও পুনঃযাচাই ব্যবস্থা রাখা হবে।
বাছাই প্রক্রিয়া সম্পর্কে মন্ত্রী বলেন, কোনো বাছাই করা হচ্ছে না। ঘরে ঘরে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। ঘরে বসে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না।
আবেদন প্রক্রিয়া:
নির্বাচনের আগে ২২ জানুয়ারি সিলেটে এক অনুষ্ঠানে তারেক রহমান বলেন, ক্ষমতায় গেলে ৪ কোটি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হবে। তিনি জানান, কার্ডটি পরিবারের প্রধান নারীর নামে হবে।
সরকার জানিয়েছে, নির্ধারিত এলাকায় এখন ঘরে ঘরে তথ্য সংগ্রহ চলছে।
পাইলট প্রকল্প চার মাসে শেষ হবে। এরপর ধাপে ধাপে দেশের সব উপজেলায় এই কর্মসূচি চালু করা হবে।
স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে জাতীয় পরিচয়পত্রের ভিত্তিতে একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেস তৈরি করা হচ্ছে। তবে আবেদন পদ্ধতি এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
পাইলট পর্যায়ে নির্বাচিতদের জাতীয় পরিচয়পত্র, রঙিন ছবি এবং একটি সচল মোবাইল নম্বর বা ব্যাংক হিসাব প্রস্তুত রাখতে বলা হয়েছে।
পরবর্তীতে নির্দিষ্ট আবেদন ফরম থাকবে। এটি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান বা সরকারি অনলাইন পোর্টাল থেকে পাওয়া যাবে।
উল্লেখ্য, নির্বাচনের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার মন্ত্রিসভা শপথ নেয়। এরপর ১৯ ফেব্রুয়ারি আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে অর্থমন্ত্রীকে প্রধান করে একটি মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়।
ঈদের আগে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ শুরুর লক্ষ্যে ওই কমিটিকে মঙ্গলবারের মধ্যে প্রাথমিক প্রতিবেদন দিতে বলা হয়।
সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই সরকার ১০ মার্চ থেকে পাইলট প্রকল্পে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে অন্যান্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিরও সমন্বয় করা হবে।
সুত্র: বিবিসি

