তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলসহ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে দেওয়া হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিল শুনানির জন্য সুপ্রিম কোর্টের আজকের (রবিবার) কার্যতালিকায় উঠেছে। প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে মামলাটি শুনানির জন্য নির্ধারিত রয়েছে।
এর আগে ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে ছয় বিচারপতির আপিল বেঞ্চ মামলাটির শুনানি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর অনুষ্ঠিত হবে বলে মুলতবি করেছিলেন।
সেদিন আদালতে রিটকারীর পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া। ইন্টারভেনর হিসেবে বক্তব্য দেন ব্যারিস্টার সারা হোসেন, ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল, অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির ও ব্যারিস্টার এস এম শাহরিয়ার কবির। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান, যিনি বর্তমানে আইনমন্ত্রীর দায়িত্বে রয়েছেন।
পটভূমিতে জানা যায়, সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলের দাবিতে রিট আবেদন করেছিলেন। পরে বিভিন্ন পক্ষ এই মামলায় যুক্ত হয়। দীর্ঘ শুনানি শেষে ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর হাইকোর্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলুপ্তিসহ পঞ্চদশ সংশোধনীর কয়েকটি ধারা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেন। একই সঙ্গে সংবিধানে গণভোটের বিধান পুনর্বহালের নির্দেশ দেন আদালত।
রায়ে হাইকোর্ট বলেন, গণতন্ত্র সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই কাঠামো অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে বিকশিত হয়। তবে বিগত তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটেনি বলে পর্যবেক্ষণ দেন আদালত। এর ফলেই দেশে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়।
হাইকোর্ট আরও পর্যবেক্ষণ করেন, সময়ের ধারাবাহিকতায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অংশে পরিণত হয়েছিল। এ কারণেই পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ২০ ও ২১ অনুচ্ছেদ, যার মাধ্যমে এ ব্যবস্থা বিলুপ্ত করা হয়েছিল, তা বাতিল ঘোষণা করা হয়। তবে আদালত সম্পূর্ণ পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল করেননি। বাকি বিধানগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়টি পরবর্তী জাতীয় সংসদের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়।
গণভোটের প্রসঙ্গেও গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দেন হাইকোর্ট। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ১৪২ ধারার একটি বিধান বাতিল করা হয়েছিল, যা দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে যুক্ত হয়েছিল। আদালত মনে করেন, এই পরিবর্তন সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। তাই ওই বিধান পুনর্বহাল করা হয়।
রায়ে আরও বলা হয়, সংবিধানের ৭ক, ৭খ এবং ৪৪(২) ধারা বাতিল করা হয়েছে। ৭ক ধারায় সংবিধান বাতিল বা স্থগিত করার মতো কর্মকাণ্ডকে অপরাধ হিসেবে উল্লেখ ছিল। ৭খ ধারায় সংবিধানের মৌলিক বিধান সংশোধন অযোগ্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছিল। আর ৪৪(২) ধারায় মৌলিক অধিকার প্রয়োগে কিছু সীমাবদ্ধতার কথা বলা ছিল। আদালত এসব ধারা সংবিধানের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ উল্লেখ করে বাতিল ঘোষণা করেন।
পরবর্তীতে হাইকোর্টের বেঞ্চের স্বাক্ষরের পর ১৩৯ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়। এর পর ৩ নভেম্বর আপিল আবেদন করা হয়। রিটকারী বদিউল আলম মজুমদারের পক্ষে আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া আপিল করেন। পরে ১৩ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্ট আপিলটি গ্রহণ করেন। আজ সেই আপিল শুনানির জন্য কার্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

