বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এবং তেল বিতরণকারী তিন কোম্পানি—পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েল কোম্পানি—এর অদক্ষতা ও অদূরদর্শিতার কারণে দেশে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় অস্থিরতা তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সময়মতো জ্বালানি তেলের মজুত ও ধারণক্ষমতা বাড়ানো না হওয়ায় বর্তমানে দেশে তেল নিয়ে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০২০ সালে সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দেশে কমপক্ষে ৬০ দিনের জ্বালানি তেল মজুতের সক্ষমতা তৈরি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে বর্তমানে দেশের মজুত ক্ষমতা রয়েছে মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ দিনের মতো। এর মধ্যে ডিজেলের মজুত রয়েছে মাত্র ১০ থেকে ১১ দিনের মতো।
জ্বালানি মজুতের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রতিবেশী অনেক দেশের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে।
-
ভারত – ৭৪ দিনের মজুত
-
পাকিস্তান ও শ্রীলংকা – প্রায় ৩০ দিনের মজুত
-
নেপাল – ১০ দিনের মজুত
-
ভিয়েতনাম – ৪৫ দিন
-
থাইল্যান্ড – ৬১ দিন
-
জাপান – প্রায় ২৫০ দিনের মজুত
বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বলেন,
“বাংলাদেশে ৩০-৩৫ দিনের মজুতকে কোনোভাবেই আপৎকালীন মজুত বলা যায় না। এটি মূলত দৈনন্দিন পরিচালনার জন্য রাখা স্টক ছাড়া আর কিছু নয়।”
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি রাতে ইরানের ওপর হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধ শুরুর মাত্র পাঁচ দিনের মধ্যে বাংলাদেশের জ্বালানি তেলের মজুত নেমে আসে মাত্র ৯ দিনে।
এই পরিস্থিতিতে সরকার সারা দেশে তেল রেশনিংয়ের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়। এর ফলে ফিলিং স্টেশনগুলোতেও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এবং তেল খাতে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, যুদ্ধ শুরুর পর ২ থেকে ৪ মার্চ পর্যন্ত তিন বিতরণ কোম্পানি স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ তেল বিক্রি করেছে।
এই তিন দিনে প্রায় ৭০ হাজার টন ডিজেল বিক্রি হয়েছে, যেখানে সাধারণ সময়ে বিক্রি হতো প্রায় ৪৫ হাজার টন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সংকটের সময় বরং তেল বিক্রিতে আরও সতর্কতা প্রয়োজন ছিল।
ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. এম তামিম বলেন,
“বিপিসি একটি অদক্ষ প্রতিষ্ঠান। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের সম্ভাবনা এক মাস ধরেই দেখা যাচ্ছিল। তাদের আরও আগে প্রস্তুতি নেওয়া উচিত ছিল।”
জ্বালানি সচিব মো. সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠকে বিপিসির অদক্ষতার বিষয়টি সামনে এসেছে।
এই ঘটনার পর বিপিসির দুই পরিচালক আজাদুর রহমান ও মুহাম্মদ আশরাফ হোসেনকে ওএসডি করা হয়েছে। আরও প্রশাসনিক পরিবর্তন আসতে পারে বলে জানা গেছে।
২০২০ সালে করোনাকালে তেলের দাম যখন ৩০ ডলারের নিচে নেমে আসে, তখন কম দামে তেল কিনে ৬০ দিনের মজুত সক্ষমতা তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু গত ছয় বছরেও সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি।
দেশে বর্তমানে তেলের মজুত রয়েছে প্রায় ১০ থেকে ১২ দিনের মতো, আর মোট মজুত সক্ষমতা রয়েছে প্রায় ৩০ দিনের মতো।
বিপিসির তথ্য অনুযায়ী দেশে জ্বালানি তেলের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে।
-
২০১৯-২০ অর্থবছর – ৫৫ লাখ টন
-
২০২০-২১ – ৬২ লাখ টন
-
২০২১-২২ – ৬৯ লাখ টন
-
২০২২-২৩ – ৭৩ লাখ টন
-
২০২৩-২৪ – প্রায় ৬৭ লাখ টন
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আগামী পাঁচ বছরে দেশের তেলের চাহিদা ১ কোটি টনের বেশি হতে পারে।
পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েল কোম্পানির বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে তারা তেল মজুতের অবকাঠামো উন্নয়নের পরিবর্তে ব্যাংকে অর্থ জমা রেখে সুদ আয়ের দিকে বেশি আগ্রহী।
এই তিন কোম্পানির কাছে বর্তমানে ৭ থেকে ১০ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত জমা রয়েছে বলে জানা গেছে।
গত অর্থবছরে কর্মচারীদের দেওয়া বোনাসও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
-
মেঘনা পেট্রোলিয়াম – প্রতি কর্মচারী প্রায় ১৮ লাখ টাকা
-
যমুনা অয়েল – প্রায় ১৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা
-
পদ্মা অয়েল – প্রায় ৬ লাখ টাকা
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের মতো দেশে কমপক্ষে ৯০ দিনের জ্বালানি তেল রিজার্ভ থাকা প্রয়োজন।
ড. ইজাজ হোসেন বলেন,
“বাংলাদেশে বছরে প্রায় চার বিলিয়ন ডলারের ডিজেল প্রয়োজন হয়। ৯০ দিনের রিজার্ভ রাখতে হলে প্রায় এক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন।”
তার মতে, বিতরণ কোম্পানিগুলোর ব্যাংকে রাখা অর্থ দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে ব্যবহার করা উচিত।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতি প্রমাণ করছে যে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ব্যবস্থা এখনো দুর্বল।
যদি আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয় বা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে বাংলাদেশ আরও বড় জ্বালানি সংকটের মুখে পড়তে পারে।

